kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৮। ৫ আগস্ট ২০২১। ২৫ জিলহজ ১৪৪২

নওমুসলিমের কথা

ফরাসি তরুণী লায়লা আফরিন যেভাবে মুসলিম হন

আবরার আবদুল্লাহ   

২৪ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফরাসি তরুণী লায়লা আফরিন যেভাবে মুসলিম হন

আমি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের এক শহরতলীতে জন্মগ্রহণ করি। আমি আমার নানা-নানির কাছে লেখাপড়া শিখি। ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত আমি একটি সাধারণ জীবনযাপন করি। লেখাপড়া ও ঘোড়ায় চড়া ছিল আমার কাজ। ঘোড়ায় চড়া ছিল আমার সবচেয়ে ভালো লাগার জিনিস। আমার নানা-নানি একটি ক্যাথলিক স্কুলে আমাকে ভর্তি করিয়েছিলেন। আমার মা ও মামাও ক্যাথলিক স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন। আমার ১৮ বছর বয়সে আমার নানা মারা যান। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু মেনে নেওয়া আমার জন্য কঠিন ছিল। তিনি আমার কাছে বাবার মতোই ছিলেন। তিনিই আমার প্রতিপালন করেছেন। আমার নানা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন, তবে চার্চে যেতেন না। চার্চের যাজক তাঁকে চিনতেন না। তাঁর শেষকৃত্যের পর আমি ধর্মচর্চা পুরোপুরি বন্ধ করে দিই। এমনকি স্রষ্টার অস্তিত্বে সন্দিহান হয়ে পড়লাম। আমি ভাবতাম, ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই, ধর্ম ছাড়াই আমরা মৃত মানুষের মধ্যে অনেক কিছু খুঁজে পেতে পারি। তবে আমার মনে কিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছিল। যেমন আমরা কেন পৃথিবীতে এসেছি? কেন মহাজগতের সৃষ্টি হলো? মহাজগতে আমরা খুব ক্ষুদ্র ও গুরুত্বহীন অংশ?  মৃত্যুর পর কি কিছু আছে? ধর্ম ছাড়া এসব প্রশ্নের উত্তর আমাকে কে দেবে?

২২ বছর বয়সে আমি কানাডার মন্ট্রিলে উচ্চতর শিক্ষার জন্য যাই। দেশের বাইরে এটাই ছিল আমার প্রথম যাত্রা। সেখানে আমি বহু মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ পাই। মন্ট্রিলে আমার বেশির ভাগ বন্ধু ছিল আরব ও খ্রিস্টান। আমরা এক সঙ্গে সিনেমা দেখতাম, রেস্টুরেন্টে খেতাম আর কখনো কখনো নাচও  করতাম।

বন্ধুদের মধ্যে একজন মুসলিম ছিল। সে অন্যদের তুলনায় বেশি ধার্মিক ছিল এমন নয়। আচার-আচরণেও সে পুরোপুরি ইসলাম অনুসরণ করত না। সে আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলে, আল্লাহর অস্তিত্ব ও মুহাম্মদ (সা.)-এর আলোচনা করে। নিজে পুরোপুরি ইসলাম পরিপালন না করলেও অন্যকে ধর্মের ব্যাপারে প্রভাবিত করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। ইসলাম সম্পর্কে সে আমাকে খুব বেশি বলেনি, তবে যতটুকু বলেছিল তা অনুসন্ধানের জন্য যথেষ্ট ছিল। আমার অনুসন্ধানের প্রথম বিষয় ছিল ইসলামে নারীর অবস্থান ও অধিকার। কেননা একজন নারী হিসেবে এ বিষয়ে আমার কৌতূহল ছিল। তা ছাড়া এ বিষয়ে মিডিয়ার ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।

আমার পাঠ শুরু হয়েছিল ইসলামে নারীর অবস্থান নিয়ে। যখন আমি জানতে পারলাম প্রাথমিক যুগে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী ছিল, তখন প্রশ্ন জাগল কেন? এরপর আমি মিলিয়ে দেখলাম—ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলামে নারীর অবস্থান। এ ক্ষেত্রে আমি বর্তমান যুগের ধর্মাবলম্বীদের চেয়ে ধর্মের উৎসগুলোকে প্রাধান্য দিলাম। অনুসন্ধানের পর স্পষ্ট হলো ইসলামই নারীকে সবচেয়ে বেশি অধিকার ও স্বাধীনতা দিয়েছে। ইসলাম নারীকে এমন কিছু অধিকার দিয়েছে, যা ফ্রান্সের নারীরা মাত্র অর্ধ শতাব্দীকাল আগে লাভ করেছে। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভের জন্য সামগ্রিক ইসলাম নিয়ে গবেষণা করা গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে ইসলামের সব কিছুকে যৌক্তিক মনে হবে। আমি ইসলামে অযৌক্তিক কিছু খুঁজে পাইনি। মাত্র তিন সপ্তাহে আমি যাবতীয় অনুসন্ধান শেষ করলাম। তখন ইসলাম আমার কাছে নব-আবিষ্কৃত রত্নতুল্য। আমি দিন-রাত ভাবলাম, নির্ঘুম রাত কাটালাম এবং শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে এই অচলাবস্থার অবসান হবে যদি আমি ইসলাম গ্রহণ করি।

ইসলাম গ্রহণের পর কানাডায় লেখাপড়া চালিয়ে যেতে কোনো সমস্যা হয়নি। সংকট শুরু হলো ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার পর।  আমার অমুসলিম পরিবার মুসলিমদের ব্যাপারে খুব সামান্যই সহনশীল ছিল, প্যারিসে আমার খুব বেশি মুসলিম বন্ধু ছিল না। তবে পরিবার থেকে স্বাধীন জীবনযাপন করায় তারা খুব সমস্যা করেনি।

ইসলাম আমার জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে। আমার খাবার, পোশাক, সম্পর্ক সব কিছু বদলে দেয়। ১৯৯৮ সালে প্রথম রমজানে আমি জাকাত প্রদান করি। ধর্মপালনের স্বাধীনতাসহ নানা কারণে আমি ফ্রান্স ত্যাগ করি। বর্তমানে আমি মরক্কোতে বসবাস করি। এখানে আমি স্বাধীনভাবে আমার ধর্মপালন করতে পারি, কর্মক্ষেত্রে লম্বা পোশাক পরিধান করতে পারি; এ ছাড়া আমি পাঁচ ওয়াক্ত আজান শুনতে ভালোবাসি।

ইসলামিক ওয়েব অবলম্বনে



সাতদিনের সেরা