kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

পরকালে সন্তানহারা মা-বাবার সম্মান

মুফতি হামেদ বিন ফরিদ   

১৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পরকালে সন্তানহারা মা-বাবার সম্মান

আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তান মা-বাবার জন্য বিশেষ অনুগ্রহ। সন্তানের মাধ্যমে মানুষের জীবন সুন্দর হয় এবং আল্লাহ ইহকাল ও পরকালে মানুষের সম্মান বৃদ্ধি করেন। মানুষ ইচ্ছা করলেই সন্তান লাভ করতে পারে না। বরং মহান আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যাকে ইচ্ছা তাকে সন্তান দান করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দেন। অথবা তাদের পুত্র ও কন্যা সন্তান উভয়ই দেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন, তিনি তো সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৪৯-৫০)

সন্তান হারিয়েছিলেন মহানবী (সা.) : সন্তান বিয়োগের কঠিন পরীক্ষায়ও ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের কর্তব্য। সবাই সন্তানের মৃত্যুতে খুবই ব্যথিত ও মর্মাহত হতে পারে। মহানবী (সা.) নিজ পুত্র ইব্রাহিমের মৃত্যুতে খুবই ভারাক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁর দুচোখ অশ্রুসজল হয়েছিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩০৩)

সন্তান হারানো মা-বাবার প্রতিদান : প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে সওয়াবের প্রত্যাশায় ধৈর্যশীল মা-বাবা ইহকাল ও পরকালে প্রভূত কল্যাণ লাভ করবেন। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো।

ক. জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপত্তা : রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে মুসলিমের তিনটি সন্তান মারা গেছে (সে যদি ধৈর্য ধরে) তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। তবে (আল্লাহর) শপথ পূর্ণ করার জন্য তাকে পুলসিরাতের ওপর দিয়ে নেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৬৫৬)

খ. মৃত সন্তান হবে জান্নাতের প্রজাপতি : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘ছোট বয়সে মৃত্যুবরণকারী সন্তানরা জান্নাতের প্রজাপতির মতো। তারা যখন বাবা অথবা মা-বাবার উভয়ের সঙ্গে মিলিত হবে, তখন তার পরিধেয় কাপড় কিংবা হাত ধরবে, যেভাবে এখন আমি তোমার কাপড়ের আঁচল ধরেছি। এরপর সেই কাপড় বা হাত আর ছাড়বে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাকে তার মা-বাবাসহ জান্নাতে প্রবেশ না করাবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৩৭০)

গ. জান্নাতে বিশেষ বাড়ি লাভ : রাসুল (সা.) বলেন, “যখন কারো সন্তান মারা যায়, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের ডেকে বলেন, তোমরা আমার বান্দার সন্তানের জান কবজ করেছ? তাঁরা বলেন, হ্যাঁ। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা তার কলিজার টুকরার জান কবজ করেছ? তাঁরা বলেন, হ্যাঁ। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা কী বলেছে? তাঁরা বলেন, আপনার বান্দা এই বিপদেও ধৈর্য ধারণ করে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েছে। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করো এবং এর নাম দাও ‘বাইতুল হামদ’ তথা ‘প্রশংসার ঘর’।” (রিয়াজুস সালেহিন, হাদিস : ১৩৯৫)

ঘ. ইবরাহিম (আ.) মৃত শিশুদের দেখাশোনা করবেন : সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদিসে রাসুল (সা.) মিরাজের ঘটনার বর্ণনায় বলেছেন, ‘আমরা চলতে চলতে একটি সজীব শ্যামল বাগানে এসে পৌঁছলাম, তাতে বসন্তের বিচিত্র ফুলের সমাহার আছে। বাগানের মধ্যে দীর্ঘকায় একজন পুরুষকে দেখলাম। তবে তাঁর মাথা আমি দেখছিলাম না। তাঁর চারপাশে বিপুলসংখ্যক ছেলে-মেয়ে দেখলাম। এত বেশি ছেলে-মেয়ে আমি কখনো দেখিনি। আমি ফেরেশতাদের বললাম, উনি কে? আমাকে বলা হলো, ইনি ইবরাহিম (আ.)। আর তাঁর আশপাশের ছেলে-মেয়েরা ওই সব শিশু, যারা শৈশবের নিষ্পাপ অবস্থায় মারা গেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪২৯)

ঙ. মা-বাবাকে অভ্যর্থনা : এক সাহাবি রাসুল (সা.)-এর কাছে নিয়মিত আসতেন। তাঁর সঙ্গে  ছোট্ট একটি বাচ্চাও থাকত। রাসুল (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি তোমার ছেলেকে ভালোবাসো? তিনি বললেন, আমার ছেলেকে আমি যতটুকু ভালোবাসি আল্লাহ আপনাকে তেমনি ভালোবাসেন। পরে ছেলেটি মারা যায়। রাসুল (সা.) ছেলেটিকে দেখতে না পেয়ে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। ওই ছেলের মৃত্যুর খবর জেনে মহানবী (সা.) তার বাবাকে বলেন, ‘তুমি কি আনন্দিত নয় যে, জান্নাতের যে দরজা দিয়েই তুমি প্রবেশ করবে, সেখানে ছেলেকে তোমার জন্য দরজা খোলার চেষ্টা করতে দেখতে পাবে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২০৭০)

আল্লাহ তাআলা সন্তানহারা সব মা-বাবাকে সওয়াবের প্রত্যাশায় ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক, জামেয়া দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়া, চট্টগ্রাম