kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

সুদবিহীন ঋণ প্রদানের মর্যাদা

মুফতি আব্দুল্লাহ আল ফুআদ   

১৭ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। লকডাউন ও নানা বিধি-নিষেধের কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ত্রাণ সহায়তায় নিম্নবিত্তদের কিছুটা সহায় হলেও বেকায়দায় আছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। চলমান এই সংকটে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক টানাপড়েনে আছে তারা। আমাদের যাদের উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে, এ সময়ে অন্তত কর্জে হাসানা তথা সুদবিহীন ঋণ প্রদানের মাধ্যমে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। আবার এই পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিদের ক্ষমা করে আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বোত্তম প্রতিদানের সৌভাগ্যও অর্জন করতে পারি।

কোনো লাভ কিংবা স্বার্থ ছাড়া শুধু আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনা শর্তে কাউকে ঋণ প্রদান করাকে ‘কর্জে হাসানা’ বা উত্তম ঋণ বলে। ইসলামে কর্জে হাসানার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। সুদবিহীন এই উত্তম ঋণ আর্থিক ইবাদতের শামিল।

পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে কর্জে হাসানা প্রদানের প্রতি উৎসাহমূলক আয়াত নাজিল হয়েছে। এই ঋণের বহুগুণ বিনিময় বৃদ্ধি ঘোষিত হয়েছে সেসব আয়াতে। ইরশাদ হয়েছে, ‘কে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে? ফলে আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ, বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। আর আল্লাহ তাআলাই রিজিক সংকুচিত করেন ও বৃদ্ধি করেন। তোমাদের তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৪৫)

‘এমন কেউ কি আছে, যে আল্লাহকে ঋণ দিতে পারে? উত্তম ঋণ, যাতে আল্লাহ তা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে ফেরত দেন। আর সেদিন তার জন্য রয়েছে সর্বোত্তম প্রতিদান।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ১১)

‘দান-সদকা প্রদানকারী নারী ও পুরুষ এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে, নিশ্চয়ই কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে তাদের ফেরত দেওয়া হবে। তা ছাড়া তাদের জন্য আছে সর্বোত্তম প্রতিদান।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ১৮)

ওই আয়াতের অনুবাদগুলোতে আল্লাহ তাআলাকে ঋণ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে গরিব-দুঃখী, অভাবী ও সংকটাপন্ন ব্যক্তিদের যেকোনোভাবে আর্থিক সহায়তা করা। এককথায়, মানবকল্যাণের সব বিষয়ই কর্জে হাসানার অন্তর্ভুক্ত।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও সাহাবায়ে কিরামদের কর্জে হাসানার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। একটি হাদিসে দান-সদকা থেকেও কর্জে হাসানার পুরস্কার কয়েক গুণ বেশি বলা হয়েছে। যথা—রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মিরাজের রজনীতে জান্নাতের একটি দরজা দেখলাম, তাতে লেখা রয়েছে যে সদকার পুরস্কার দশ গুণ ও কর্জে হাসানার পুরস্কার আঠারো গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে।’

লেখাটি পড়ে রাসুল (সা.) তাঁর খিদমতে নিয়োজিত ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আমাকে বলবে এর কারণ কী? ফেরেশতা জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! এর কারণ হলো, ভিক্ষুক তার কাছে কিছু অবলম্বন থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষা চায়; কিন্তু কোনো প্রকৃত অভাবী বিপদে না পড়লে ঋণ চায় না। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৩১)

ঋণ পরিশোধে অক্ষমকে মাফ করার পুরস্কার

ক্ষমাকারী বান্দা আল্লাহর কাছে অনেক প্রিয়। কারণ ক্ষমা আল্লাহর বিশেষ গুণ। আল্লাহ ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। তাই ঋণ পরিশোধে অপারগ ব্যক্তিকে ক্ষমার পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ তাআলা আরশের ছায়া দান করবেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে লোক অভাবী ও ঋণগ্রস্তকে সুযোগ প্রদান করে অথবা ঋণ মাফ করে দেয়, কিয়ামতের দিবসে আল্লাহ তাআলা তাকে নিজের আরশের ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করবেন, যেদিন তাঁর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। (তিরমিজি, হাদিস ১৩০৬)

ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়িয়ে দিলে আল্লাহ তাআলা দান-সদকার সমতুল্য সওয়াব দান করেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি (ঋণগ্রস্ত) অভাবী ব্যক্তিকে অবকাশ দেবে, সে দান-খয়রাত করার সওয়াব পাবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪১৮)

আল্লাহ তাআলা আমাদের অভাবী, গরিব ও আর্থিক সংকটাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করুন।