kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

রমজানে প্রতিবেশীর হক আদায়ের সুযোগ

রমজানের শেষ সময়ে ঈদ সামনে রেখে আমাদের সবার উচিত প্রতিবেশীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা

মুফতি আবদুল্লাহ আল ফুআদ   

১১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সমাজবদ্ধ পৃথিবীতে মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিবেশীর গুরুত্ব অপরিসীম। দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনায় এই প্রতিবেশীই মানুষের নিত্যসঙ্গী। তবে বিপরীত বাস্তবতা হলো, কখনো সামান্য রাগ, ক্ষোভ ও ঝগড়া-বিবাদকে কেন্দ্র করে এই প্রতিবেশীর সঙ্গেই আমাদের অনেক দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। কথাবার্তা তো নয়ই, পারস্পরিক দেখাদেখিও অসহনীয় হয়ে দাঁড়ায়। আবার গরিব প্রতিবেশীকে জাকাত-সদকা প্রদানের ক্ষেত্রেও এই দূরত্ব অন্তরায় হয়। অথচ ইসলাম প্রতিবেশীর হক ও অধিকারকে মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের অধিকারের পাশেই স্থান দিয়েছে। নির্দেশ দিয়েছে তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। কোনো কিছুকে তার সঙ্গে শরিক কোরো না এবং মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, মুসাফির ও তোমাদের দাস-দাসীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)

সামাজিক সহাবস্থানের কারণে পারস্পরিক তর্কাতর্কি ও ঝগড়া-বিবাদ হতেই পারে। এসব জিইয়ে রাখা উচিত নয়। প্রকৃত ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা। কারণ প্রতিবেশীর প্রতি সম্মান ও সদাচরণকে ঈমানের অনুষঙ্গ সাব্যস্ত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি হাদিস এসেছে। আবু শুরাইহ (রা.) বলেন, ‘আমার দুই কান শ্রবণ করেছে, আমার দুই চক্ষু প্রত্যক্ষ করেছে যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীকে সম্মান করে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)

রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর শপথ সে (প্রকৃত) মুমিন নয়! আল্লাহর শপথ সে মুমিন নয়!! আল্লাহর শপথ সে মুমিন নয়!!! সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, সে কে হে আল্লাহর রাসুল? রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়। (বুখারি, হাদিস : ৬০১৬)

ইসলাম প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচার ও সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের অভাব-অনটনে পাশে থাকার প্রতিও উদ্বুদ্ধ করেছে। ক্ষুধার্ত প্রতিবেশী রেখে যে মুমিন উদরপূর্তি করবে, ইসলাম তাকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ওই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেটপুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১১২)

দরিদ্র ও অসহায়কে খাবার খাওয়ানো অনেক সওয়াবের কাজ। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই প্রতিবেশী দরিদ্রদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তা ছাড়া কোরআন মাজিদে ‘ছাকার’ নামের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে দরিদ্রদের খানা না খাওয়ানোকে অন্যতম গণ্য করা হয়েছে। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘(জাহান্নামিকে জিজ্ঞেস করা হবে) কোন বিষয়টি তোমাদের ছাকার নামের জাহান্নামে ঠেলে দিয়েছে? (তারা বলবে) আমরা নামাজ পড়তাম না এবং দরিদ্রকে খাবার খাওয়াতাম না।’ (সুরা : মুদ্দাসসির, আয়াত : ৪২-৪৪)

পারস্পরিক সুসম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে হাদিয়ার আদান-প্রদান খুবই কার্যকর। এতে হৃদ্যতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হাদিয়া আদান-প্রদান করো। এর মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে হৃদ্যতা সৃষ্টি হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৪)

প্রতিবেশীদের খুব সামান্য কিছু হলেও হাদিয়া দিতে পারি আমরা। সেটা সুস্বাদু তরকারির ঝোলও হতে পারে। এক হাদিসে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) হজরত আবু জর (রা.)-কে বললেন, ‘হে আবু জর, তুমি ঝোল (তরকারি) রান্না করলে তার ঝোল বাড়িয়ে দিয়ো এবং তোমার প্রতিবেশীকে তাতে শরিক কোরো।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬২৫)। ফজিলতপূর্ণ রমজানের শেষ সময়ে এবং ঈদ সামনে রেখে আমাদের সবার উচিত প্রতিবেশীদের প্রতি ভালোবাসা ও  সহমর্মিতা প্রকাশ করা। সর্বোপরি তাদের অভাব-অনটনে সাহায্য-সহায়তার হাতকে প্রসারিত করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন।

লেখক : মুদাররিস, মারকাযুত তাকওয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা