kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

স্টক সুকুক ও মিউচুয়াল ফান্ডের জাকাত

ড. ইকবাল কবীর মোহন   

৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্টক সুকুক ও মিউচুয়াল ফান্ডের জাকাত

জাকাত ইসলামী বিধানের অন্যতম মৌলিক বনিয়াদ। জাকাত শুধু জাকাতযোগ্য সম্পদের মালিক মুসলমানের ওপর ফরজ। জাকাতের মাধ্যমে অভাবী ও সম্পদহীন মানুষ যেমন উপকৃত হয়, তেমনি এর মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের অভাব-অনটন দূর হয়। ধনী-গরিবের মধ্যে মমতা, ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হয়। জাকাত প্রদানের জন্য আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, যদি তোমরা সালাত কায়েম করো, জাকাত দাও।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ১২)

আল্লাহ আরো বলেন, ‘এবং তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে নামাজ কায়েম করি এবং জাকাত দিতে থাকি যত দিন বেঁচে থাকি।’ (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ৩১)

হাদিসেও জাকাতের নির্দেশনা সম্পর্কে বলা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, পাঁচটি বস্তুর ওপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত। এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা এবং রমজানের রোজা রাখা। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

বিভিন্ন সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হয়। এখানে বিনিয়োগ, স্টক ও শেয়ারের ওপর জাকাতের বিধান সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো—

বিনিয়োগের জাকাত : অতিরিক্ত আয়ের উদ্দেশ্যে মানুষ বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ, যেমন—স্টক, মিউচুয়াল ফান্ড, সুকুক (বন্ড) ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করে। এগুলোর ওপর জাকাত প্রযোজ্য।

স্টক : স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কম্পানির শেয়ারকে স্টক বলে। ডিভিডেন্ড আয় এবং মুনাফা অর্জনের জন্য স্টকে বিনিয়োগ করা হয়। কেউ কেউ অতালিকাভুক্ত শেয়ারেও বিনিয়োগ করে। এসব শেয়ারের মূল্য তাৎক্ষণিক জানা না গেলেও এসব শেয়ারের মূল্য যৌক্তিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করে তার ওপর জাকাত দিতে হবে।

মিউচুয়াল ফান্ড : ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত না হলেও মিউচুয়াল ফান্ডের মূল্য বিনিয়োগকারীরা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে অবগত হতে পারেন।

সুকুক : এটি ইসলামিক বন্ড, যা বিভিন্ন কম্পানির দায়কে নির্দেশ করে এবং এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট হারে মুনাফা পেতে পারেন। এটি শেয়ার বা স্টকের বিপরীত একটি উপায়, যেখানে স্টক বা শেয়ারে অনির্ধারিত হারে ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়। সুকুকের মূল্য সাধারণত সহজে পাওয়া যায় না। তবে সুকুক ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান বা অন্য উৎস থেকে এর মূল্য জানা যায়।

স্টক ও শেয়ারের ওপর জাকাত : শেয়ারের জাকাত হিসাব করার বিষয়টি নির্ভর করে বিনিয়োগকারীর মোট ক্রয় করার সময়ের ইচ্ছার ওপর। যদি ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে (ট্রেডিং) মুনাফা করার উদ্দেশ্যে স্টক/শেয়ার ক্রয় করা হয়, তাহলে স্টকের বাজারমূল্যের ওপর বছরান্তে ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত প্রযোজ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি শেয়ারের ক্রয়মূল্য ৫০ টাকা হয় এবং জাকাত হিসাব করার দিন এর বাজারমূল্য ৬০ টাকা হয়, তাহলে শেয়ারের মূল্য ৬০ টাকা করে ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত দিতে হবে।

উদাহরণ : একজন বিনিয়োগকারী এবিসি কম্পানির ১,০০,০০,০০০/- টাকার স্টক পহেলা জানুয়ারি ২০২০ সালে ক্রয় করল (প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ৫০ টাকা হিসাবে মোট ২,০০,০০০ শেয়ার)। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রতিটি শেয়ারের বাজারমূল্য মোট ২,০০,০০০ – ৬০ = ১,২০,০০,০০০ টাকা এ হিসাবে ২.৫ শতাংশ হারে জাকাতের পরিমাণ দাঁড়াবে = ৩,০০,০০০ টাকা।

আর যদি বিনিয়োগকারীর উদ্দেশ্য থাকে শেয়ার থেকে ডিভিডেন্ডের (যে মুনাফা কম্পানি বিতরণ করে) সুবিধা নেবেন, তাহলে তিনি জাকাতের হিসাব করবেন এভাবে—বিনিয়োগকারী কম্পানির স্থায়ী সম্পদ ও তরল সম্পদের পরিমাণ জানবেন এবং শেয়ারে তাঁর যে বিনিয়োগ আছে কম্পানির তরল সম্পদ অনুপাতে তিনি জাকাত দেবেন। কম্পানির স্থায়ী সম্পদ বলতে বোঝাবে ওই কম্পানির দালান, যন্ত্রপাতি, গাড়ি প্রভৃতি এবং তরল সম্পদ বলতে বোঝাবে এর নগদ অর্থ, ব্যবসা-বাণিজ্যে মালপত্রের মজুদ, কাঁচামাল, উৎপাদিত পণ্য এবং আদায়যোগ্য অর্থ বা বাণিজ্য বিল। ধরা যাক, কম্পানির স্থায়ী সম্পদ সামগ্রিক সম্পদের ৬০ শতাংশ এবং তরল সম্পদ ৪০ শতাংশ। শেয়ারহোল্ডার তাঁর শেয়ারের বাজারমূল্য ধরবেন এবং কম্পানির তরল সম্পদের ৪০ শতাংশের ওপর জাকাত হিসাব করবেন। উদাহরণ : ওপরের অবস্থা থেকে ধারণা করা হলো যে কম্পানির তরল সম্পদ ৪০ শতাংশ এবং স্থায়ী সম্পদ ৬০ শতাংশ। তাহলে জাকাত হিসাব করা হবে এভাবে—

এখানে উল্লেখ্য যে কম্পানির স্থায়ী ও তরল সম্পদের পরিমাণ জানা থাকলে পুরো বাজারমূল্যের ওপর জাকাত দিতে হবে (ওপরে প্রদর্শিত জাকাত নির্ধারণ করার পদ্ধতি মুফতি তকি উসমানি গ্রহণ করেছেন)। সারা বছর শেয়ার কেনা হয়ে থাকলে তার ওপর জাকাত প্রযোজ্য হবে না, যদি না তা পুরো বছর বিনিয়োগকারীর কাছে  থাকে। তবে জাকাত ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে বছরের শেষে শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া এবং বছরের শুরুতে তা আবার কিনে নেওয়া নিষিদ্ধ। ডিভিডেন্ডের জাকাত হবে নগদ এবং ব্যাংক স্থিতির অংশ। যদি বিনিয়োগ কম্পানি তার শেয়ারের ওপর জাকাত দিয়ে দেয়, তাহলে বিনিয়োগকারী জাকাতের দায় থেকে মুক্ত থাকবেন। তবে বিনিয়োগকারী এই মর্মে কম্পানির কাছ থেকে একটি লিখিত নিশ্চয়তাপত্র নিয়ে নেবেন।

মিউচুয়াল ফান্ড এবং সুকুকের ওপর জাকাতের বাজারমূল্য ২.৫ শতাংশ হারে প্রদান করতে হবে।

সুদভিত্তিক বন্ড ও বিনিয়োগের ওপর জাকাত : বলা আবশ্যক যে ইসলামে সব ধরনের সুদ নিষিদ্ধ। তাই সুদ থেকে অর্জিত আয়ের ওপর জাকাত প্রযোজ্য নয়। কারণ এটি বেআইনি সম্পদ। তবে সব ধরনের সুদি আয় দাতব্য কাজে সওয়াবের আশা ব্যতিরেকে বিতরণ করে দেওয়া যেতে পারে। তবে সুদি বিনিয়োগের মূল/আসলের ওপর জাকাত প্রযোজ্য হবে।

ইসলামী সরকারের প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের জাকাত : ইসলামী সরকারের প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, আওকাফ (বৃত্তি) দাতব্য সমিতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে জাকাত দিতে হবে না।

লেখক : সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক

কো-অর্ডিনেটর, ইসলামী ব্যাংকিং কনভারশন

প্রজেক্ট, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড