kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

আমেরিকার এক কবরস্থানের কথা

ড. নেসার আহমেদ   

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমেরিকার এক কবরস্থানের কথা

আমেরিকায় আমি কিছুদিন আমাদের কবরস্থানের দায়িত্বে ছিলাম, যখন আমি মসজিদের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। কবরগুলো মুসলমানদের দানের পয়সায় কেনা, তাই গরিবদের জন্য বিনা মূল্যে আর বিত্তবানদের জন্য মসজিদ কমিটি একটা টাকা নির্ধারণ করেছে। খ্রিস্টানদের কবরস্থানের এক কোনায় ৪০টি কবর কিনেছিল অনেক আগে, পরে আরো ৪০টি নতুন কবরের স্থান কেনার সময় দাম বেড়ে যাওয়ায় আমরা আগের ৪০টির অব্যবহৃত কবরগুলো বিক্রি করি। আমিও দুটি কবরের স্থান কিনলাম (সি-৫ ও সি-৬), একটা আমার জন্য, আরেকটা আমার বেগম সাহেবার জন্য। আর এখানেই আমার ঘটনা শুরু।

আমি জানি না কোথায় আল্লাহ আমার মৃত্যু ঠিক করে রেখেছেন আর কোথায় আমার কবর হবে। তবে কবর দুটি কেনার পর আমার মধ্যে আমূল পরিবর্তন এলো। যখনই ওখানে কবর জিয়ারত করতে যাই, সাধারণত ফজরের নামাজের পরে, ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে যায়। আমার মরণের পর আমার ছেলেরা, তারপর হয়তো আমার নাতিরা এসে দোয়া পড়বে। তারপর হয়তো আর কেউ আমাকে মনে রাখবে না। এখানে হাজার হাজার বছর থাকতে হবে হাশরের মাঠের ডাক আসা পর্যন্ত।  যদি আল্লাহ মাফ না করেন, তাহলে কী হবে?

কবরের আজাব যে ভয়াবহ! আমার মরণের পর আমার ডক্টরেট ডিগ্রি, ধনসম্পদ, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে কোনো কাজে আসবে না। দুনিয়ায় অনেক কিছু করার স্বপ্ন দেখতাম, এখন সব বাদ। নিয়ত করেছিলাম, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়ব, বাকি সব পরে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সব সময় তা-ও পারি না। তবে চেষ্টা করছি দুনিয়ার সব অপকর্ম থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে। সেখানেও অনেক বাধা। সুদ থেকে শুরু করে ইন্টারনেট, সিনেমা, সমাজের অনেক কিছু এখন নরমাল হয়ে গেছে। এর থেকে কিভাবে উত্তরণ পাব জানি না।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন, ‘হে ঈমানদাররা! আল্লাহকে যেমনভাবে ভয় করা উচিত, ঠিক তেমনি ভয় করো। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০২) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ওয়ার্নিং দিচ্ছেন, আমি কিভাবে এটা পূর্ণ করব? মৃত্যুর সময় আমার মনোজগৎ তো আমার নিয়ন্ত্রণে না-ও থাকতে পারে। কী হবে জানি না!  আসলে আল্লাহ মাফ না করলে আমাদের কোনো উপায় নেই।

আমাদের এক বাংলাদেশি কাজি ভাই মারা গেলেন আমাদের  (Huntsville AL) শহর থেকে ৫০ মাইল দূরে  Florence AL.  ওই শহরে তারাই একমাত্র বাংলাদেশি পরিবার, আর ছিলেন ভারতীয় এক মুসলমান ডাক্তার—ডা. আহমেদ, অত্যন্ত অমায়িক মানুষ। আমাকে খবর দিলেন, ভাবি অনেক কান্নাকাটি করছেন, উনি ভাইকে খ্রিস্টানদের কবরের স্থানে কবর দিতে চান না। উনি আমাদের শহরের কবরের স্থানে কবর দিতে চান। আমরা দলেবলে গিয়ে লাশ নিয়ে এলাম। উনি আমাদের জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আত্মীয়।

আমি কোনো দিন লাশ ধোয়াইনি। ডা. আহমেদও তা-ই। আমরা দুজন জোগালির কাজ নিলাম।  ডা. মোস্তফা আবুশাগুর  (Libya’s First Elected Prime Minister) এবং Br.  আল-হাদী   (Libya’s run away Minister from Coln. Gaddafi’s cabinet) এলেন, আর উনাকে ধোয়ালেন। উনারা দুজন একসঙ্গে সুবহানাল্লাহ বলে উঠলেন। উনাকে এত সুন্দর লাগছিল, শুধু তা-ই নয়, আমরা একটা দারুণ খুশবু পাচ্ছিলাম। এটা আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা।

পরে ডা. মোস্তফা আবুশাগুরকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি বলেন, আল্লাহই একমাত্র বিচারক, তবে মানুষ মুমিন বান্দার অনেক সিম্পটম দেখতে পায়।

আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, আল্লাহ যেন আমার মৃত্যুর সময় আমার মুখে কলেমা তুলে দেন আর সৌভাগ্যবানদের দলভুক্ত করেন। আমিন।

 



সাতদিনের সেরা