kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

বাংলা কবিতায় রমজান

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ   

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বাংলা কবিতায় রমজান

রোজা ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম। বাঙালি মননে রোজা-রমজানের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে নানা আঙ্গিকে। কবি শাহাদাৎ হোসেন পবিত্র রমজানের আগমনী বার্তা শুনিয়েছেন :

‘তোমারে সালাম করি নিখিলের হে চির কল্যাণ—

জান্নাতের পুণ্য অবদান!’

মুসলিম মনন ও চেতনায় রোজার স্পষ্ট উপস্থিতি এবং মহান আল্লাহর অপরিমেয় রহমতের অমীয় সুধা পানের সৌভাগ্যের বর্ণনা পাওয়া যায় ফজল-এ-খোদার অসংখ্য রচনায়। রমজানের শিক্ষা ও ঈমানদারের প্রত্যাশা কত তাৎপর্যপূর্ণ ফজল-এ-খোদার এমন নিবেদনে তা আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যখন তিনি লিখলেন :

আল্লাহ তোমার হাজার শোকর

দিলে মাহে রমজান—

অধম নাদান বান্দার তরে

তুমি যে মেহেরবান।

রমজানের এই রহমতি মাস

মিটায় প্রাণের বেহেশতি আশ।

মাহে রমজান মুমিনের জন্য ইবাদতের ফল্গুধারা নিয়ে আসে, যেন চির বসন্তের দোলা লাগে এ মাসে। ইন্দ্রিয় কামনা-বাসনাবিমুক্ত হয়ে মুমিন বান্দা নিজেকে গড়ে তোলে জান্নাতি আবহ ও ফেরশতাদের অনন্য যোগ্যতায়। তাই ‘রোজা ও ঈদ’ প্রবন্ধে সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ লেখেন ‘...কি কঠোর কৃচ্ছ্রতা ও সংযম সাধনা। এক টানা ৩০ দিনের উপবাস। দিনে রোজা, আর রাতে ইবাদত। ইন্দ্রিয়রা সবাই শৃঙ্খলিত বন্দি...।’

রোজার অনন্য তাৎপর্য প্রসঙ্গে ‘কারো মনে তুমি দিয়ো না আঘাত সে আঘাত লাগে কবির ঘরে...’ গানের গীতিকার কবি আজিজুর রহমান তার ‘রোজা’ কবিতায় লিখেছেন :

‘রোজা রেখে করো অনুভব

ক্ষুধার কেমন তাপ

দেহমনের সেই সাধনায়

পুড়িয়ে নে তোর পাপ।’

সুর-সৃষ্টির জয়গাথায় কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি মননে মুসলিম আবহ জাগিয়েছেন। মুসলিম বাংলাদেশের রূপকল্প এঁকেছেন তাঁর দরদি স্পর্শে। আমাদের সংস্কৃতির পূর্ণতাদানে নজরুলের ঋণ অপরিশোধ্য। তাঁর কাছে ফিরে আসতে হয় বারবার। তিনি ‘কেন জাগায়লি তোরা’ কবিতায় রমজানকে বিশ্লেষণ করেছেন আমাদের জাতীয় মানস পটভূমিতে :

“মাহে রমজান এসেছে যখন, আসিবে ‘শবে কদর’,

নামিবে তাহার রহমত এই ধূলির ধরার পর।

এই উপবাসী আত্মা, এই যে উপবাসী জনগণ,

চিরকাল রোজা রাখিবে না, আসে শুভ ‘এফতার’ (ফিতার) ক্ষণ।”

রোজা উচ্চমর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। জাতীয় অধ্যাপক অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, ‘কাম প্রবৃত্তি অসংযত সন্তোষ বিধানের ফলে মানুষ পশুত্বের চরম স্তরে নেমে যায়। ক্রোধ মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তোলে। লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। এ জন্য এগুলোর দাহনের জন্য এ দুনিয়ায় আল্লাহ্ সিয়ামের প্রবর্তন করেছেন। যাতে এ দাহনের ফলে মানুষ এ বিশ্বে তার প্রকৃত স্থান নির্দিষ্ট করতে পারে, সে যাতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা ঠরপব-মবত্বহঃ হিসেবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে...।’ (প্রবন্ধ : সিয়ামের তাৎপর্য)

মাহে রমজানের শ্রেষ্টতম বৈশিষ্ট্য লাইলাতুল কদর। এ মহিমান্বিত রজনীকে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেয় বলা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। তাই মুসলিম জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ তাঁর শবেকদর কবিতায় লাইলাতুল কদরকে ব্যাখ্যা করেছেন :     ‘এখনো সে পুণ্য রাত্রি নামে পৃথিবীতে, কিন্তু

এক অন্ধকার ছেড়ে অন্য এক আঁধারে হারায়,

ঊর্ধ্বে ইঙ্গিত আসে লক্ষ মুখে, অজস্র ধারায়;

নর্দমার কীট শুধু পাপ-পঙ্কে খোঁজে পরিত্রাণ।

...আত্মার প্রশান্তি গ্রাস করে ছায়া উদ্ভ্রান্ত মতের;

সে আজ দেখাতে রাহা এ সংশয়ে,...শবে কদরের

(কত অপলক দৃষ্টি জাগে আজও যে পথ-সন্ধানে);

জুলমাতের এলাকায় বলে দাও নিঃসঙ্গ খিজির।

রমজানের বিদায়ে আসে ঈদ। কাজী নজরুলের ভাষায় ‘রমজানের রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...।’

রমজান ও ঈদে গরিব-দুঃখী সবার জন্য আনন্দ যেন সমান হয়—এটাই তো প্রত্যাশিত।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

 ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ

কাপাসিয়া, গাজীপুর



সাতদিনের সেরা