kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

নবী-জীবনী

কাবাগৃহে মুসলমানদের প্রথম নামাজ

৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইসলাম আগমনের পর থেকেই মক্কার মুশরিকরা মহানবী (সা.) ও মুসলিমদের নানাভাবে কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা করে। মুসলিমরা প্রকাশ্যে ইসলামের কথা বলতে পারত না এবং কোনো ইবাদত-বন্দেগি করতে পারত না। আল্লাহ চরম ভীতিকর অবস্থার পরিবর্তন ঘটান হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.) ও ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে। উভয়ে ছিলেন আরবের বিখ্যাত যোদ্ধা ও সাহসী পুরুষ।

নবুয়তের ষষ্ঠ বছর জিলহজ মাসে মহানবী (সা.)-এর চাচা হামজা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। একদিন আবু জাহেল সাফা পাহাড়ের কাছে মহানবী (সা.)-কে অশ্লীল ও অশালীন ভাষায় গালমন্দ করে এবং পাথর মেরে তাঁর মাথা ফাটিয়ে দেয়। আবদুল্লাহ ইবনে জুদয়ানের দাসী হামজা (রা.)-কে এ ঘটনার কথা বলে। তিনি তখন শিকার থেকে ফিরছিলেন। ঘটনা শুনে তিনি অত্যন্ত রেগে যান। তিনি আবু জাহেলকে কাবা চত্বরে খুঁজে পান এবং ধনুক দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করেন। তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘তুমি আমার ভাতিজাকে গালি দিচ্ছ এবং কষ্ট দিচ্ছ, অথচ আমিও তাঁর দ্বিনের অনুসারী।’ বনু মাখজুম আবু জাহেলের সাহায্যে এগিয়ে আসতে চাইলে সে দোষ স্বীকার করে বলে, ‘তোমরা সংযত হও। সত্যি আমি তার ভাতিজাকে জঘন্য ভাষায় গালি দিয়েছিলাম।’ এভাবে আল্লাহ হামজা (রা.)-এর অন্তরকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ১১৯)

মক্কার মুশরিকদের অত্যাচার দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকলে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ! ওমর ইবনে হিশাম (আবু জাহেল) ও ওমর ইবনুল খাত্তাবের মধ্যে যে ব্যক্তি তোমার কাছে বেশি পছন্দনীয়, তাকে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দাও এবং তার দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করো।’ আল্লাহর ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে পছন্দ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কোনোভাবে ফেরাতে না পেরে মুশরিকরা তাঁকে হত্যা করার জঘন্যতম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি যখন নবীজি (সা.)-কে হত্যা করতে যাচ্ছিলেন তখন নুয়াইম বিন আবদুল্লাহ (রা.) তাঁকে বলেন, ‘আগে আপন ঘর সামলাও, তোমার বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ বিন জায়েদ ইসলাম গ্রহণ করেছে।’ ওমর (রা.) তখন বোনের বাড়ি উপস্থিত হন। সেখানে খাব্বাব ইবনে আরত (রা.) তাঁদের সুরা ত্বহা শেখাচ্ছিলেন। ওমর (রা.) বাইরে থেকে তাঁদের তিলাওয়াত শুনতে পান। ঘরে ঢুকে কী পাঠ করা হচ্ছিল জানতে চান। ইসলাম গ্রহণের কথা স্বীকার করলে ভগ্নিপতিকে বেদম প্রহার করেন। স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে বোনকেও আঘাত করেন। এতে তিনি রক্তাক্ত হন। বোনের রক্ত দেখে তাঁর মন বিচলিত হয়। এরপর ওমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা কী পাঠ করছিলে আমাকে দেখাও।’ তাঁরা জানান, পবিত্র কোরআন পবিত্র না হয়ে স্পর্শ করা যায় না। তখন ওমর (রা.) গোসল করে এলেন এবং সুরা ত্বহা পাঠ করে বললেন, ‘এটা খুবই উত্তম কথা। আমাকে মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে নিয়ে চলো।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন সাফা পর্বতের অদূরে আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ওমর (রা.) সেখানে উপস্থিত হলে সাহাবিরা ভয় পেয়ে যান। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পথ ছেড়ে দিতে বলেন। তিনি আবারও দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ! তার মাধ্যমে দ্বিনের সম্মান ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করুন।’ সঙ্গে সঙ্গে ওমর (রা.) কলেমা পাঠ করে মুসলিম হয়ে যান। উপস্থিত সাহাবিরা আনন্দে তাকবিরধ্বনি দেন।

ইসলাম গ্রহণের পর ওমর (রা.)-এর অনুরোধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-সহ মুসলিমরা দুই কাতারে সারিবদ্ধ হয়ে মক্কা প্রদক্ষিণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন তাঁকে ‘ফারুক’ (সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী) উপাধি দেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ইসলামগ্রহণ ছিল ইসলামের বিজয়। তাঁর ইসলামগ্রহণের আগে আমরা কাবার সামনে স্বাধীনভাবে নামাজ আদায় করতে পারতাম না। তিনি যখন মুসলিম হলেন, তখন তিনি কুরাইশের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং কাবার সামনে নামাজ আদায় করেন। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও নামাজ পড়ি।’ (মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস : ১/২২৯-২৩৬; সিরাতে মোস্তফা : ১/২৫২-২৫৭; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ১২০-১২৭)

 

গ্রন্থনা : আতাউর রহমান খসরু

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা