kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০২২ । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী তিন মাদরাসা

২৬ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী তিন মাদরাসা

মাদরাসা প্রাঙ্গনে শুয়ে আছেন ২১ শহীদ

১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ যে ভয়াবহ গণহত্যা, ধ্বংস ও পাশবিকতার মুখোমুখি হয়েছিল, তা থেকে রক্ষা পায়নি দেশের মাদরাসা-মসজিদগুলোও। মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, ক্ষত ও স্মৃতি নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে দেশের সুপ্রসিদ্ধ তিনটি মাদরাসা। মুক্তিযুদ্ধে মাদরাসাগুলোর ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন আতাউর রহমান খসরু

যশোর রেলস্টেশন মাদরাসায় শুয়ে আছেন ২১ শহীদ

২৫ মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার পর দেশের যেসব অঞ্চলে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল যশোর ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চল তার অন্যতম। সাধারণ বাঙালি ও ইপিআর সদস্যরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল সেখানে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু স্থানীয় বিহারি ও রাজাকারদের সহযোগিতায় ৩ এপ্রিল সে প্রতিরোধ ভেঙে যায়। এরপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রতিশোধ স্পৃহায় চতুর্দিকে জ্বালাও পোড়াও শুরু করে। দিশাহারা সাধারণ মানুষ তখন মাওলানা আবুল হাসান আলী যশোরী (রহ.) কর্তৃক পরিচালিত জামিয়া এজাজিয়া দারুল উলুমে আশ্রয় নেয়, যা যশোর রেলস্টেশন মাদরাসা নামে পরিচিত। মহেশপুরের তৎকালীন আওয়ামী লীগের এমপি মঈনউদ্দীন মিয়াজির অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, ছেলে-মেয়েকে তিনি নিজে মাদরাসায় নিয়ে আসেন। এ সংবাদ পেয়ে ৪ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মাদরাসায় আক্রমণ করে। উপস্থিত মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ও সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। মাওলানা যশোরীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়। তবে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় তিনি বেঁচে যান। তিনি টয়লেটে আশ্রয় নিলেও সেখানে গুলি ছোড়া হয়। দোতলায় তাঁর থাকার রুমটি শেল মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

সেদিন মাওলানা যশোরীসহ ২৩ জনকে গুলি করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২১ জনই শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা হাবিবুর রহমানসহ পাঁচ শিক্ষার্থীও ছিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে মাস্টার আব্দুর রউফ এবং আলহাজ কাজী আ. গনী উল্লেখযোগ্য। শহীদদের মাদরাসা প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।

চরমোনাই মাদরাসায় ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প

চরমোনাই আহছানাবাদ রশীদিয়া কামিল মাদরাসার সূচনা চরমোনাই দরবারের প্রতিষ্ঠাতা পীর মাওলানা সৈয়দ এছহাক (রহ.)-এর হাতে। ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল ও ক্যাপ্টেন আবদুল লতিফসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা নিয়মিত মাওলানা এছহাক (রহ.)-এর কাছে যাতায়াত করতেন। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস চরমোনাই আলিয়া মাদরাসা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের শক্ত ঘাঁটি। মাদরাসার পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দুই-তিন কক্ষ ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁরা সেখানে অস্ত্র মজুদ, খাবার, বিশ্রাম ও পরামর্শ করতেন। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাঁদের যথাসাধ্য আপ্যায়ন করত। মাওলানা এছহাকের নির্দেশে তাঁর জামাতা মাওলানা ইউসুফ আলী খান সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ‘কাজি’ তথা পারস্পরিক মতভিন্নতা হলে মীমাংসাকারীও ছিলেন। যুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের অস্ত্রগুলো মাওলানা ইউসুফ আলী খানের কাছে গচ্ছিত রেখে যান, যা তিনি পরবর্তী সময়ে দারোগা আবদুল মান্নানের হাতে সোপর্দ করেন। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় বরিশাল থানার বহু বাঙালি কর্মকর্তা সপরিবারে মাদরাসায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন এবং মাদরাসা থেকেই তাঁরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বের হতেন।

যুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পটিয়া মাদরাসা

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে আরো অনেকের মতো বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। ফলে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রের ওপর হানাদার বাহিনীর শ্যেনদৃষ্টি পড়ে। তাদের হাত থেকে সম্প্রচারকেন্দ্রটি রক্ষা করতে মেজর জিয়া পটিয়া মাদরাসায় আশ্রয় নেন। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগত জানান। পটিয়া মাদরাসার মেহমানখানা ছেড়ে দেন তাঁদের জন্য। সেখানে তাঁরা অস্থায়ী বেতারকেন্দ্রটি পুনরায় চালু করেন। তবে হানাদার বাহিনীর আক্রমণের ভয়ে তাঁরা দ্রুততম সময়ে পটিয়া মাদরাসা ত্যাগ করেন।

মুক্তিযোদ্ধারা চলে যাওয়ার পরও মাদরাসাটিকে শাস্তি পেতে হয়। পাকিস্তানি বিমান বাহিনী মাদরাসায় বোম্বিং করে। বোমা হামলায় পুকুরপাড়ে অবস্থিত একটি ভবন পুরোপুরি ধসে যায়। হামলায় পটিয়া মাদরাসার শিক্ষক আল্লামা আবদুল মান্নান দানিশ (রহ.) শহীদ হন। জনপ্রিয় এই শিক্ষককে জ্ঞানের ‘রাজি’ বলা হতো। এ সময় অপর শিক্ষক কারি জেবুল হাসানের এক মেহমানও শহীদ হন। আহত হন আরো বহু লোক। পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর হামলায় সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘এদারাতুল মাআরিফ’-এর অফিস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর পরিচালক মাওলানা হারুন ইসলামাবাদীর বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

তথ্যঋণ : আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে



সাতদিনের সেরা