kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

ঐতিহাসিক দরসবাড়ি মসজিদ

মাইমুনা আক্তার   

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ঐতিহাসিক দরসবাড়ি মসজিদ

গৌড় লখনৌতির বাংলাদেশ অংশের মধ্যে সর্ববৃহৎ মসজিদ এটি। বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত। ছোট সোনা কোতোয়ালি দরওয়াজা রোডের পশ্চিমে মধ্যযুগীয় শহরের দরসবাড়ি এলাকায় অবস্থিত, যা বর্তমানে ভারতীয় সীমান্তের নিকটবর্তী একটি পতিত এলাকা।

দরসবাড়ি মানে হলো বিদ্যাপীঠ। মূলত একটি মাদরাসাকে কেন্দ্র করে এই মসজিদটি গড়ে উঠেছে। বর্তমানে কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত এর শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদটি ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে শামসুদ্দীন আবুল মুজাফফর ইউসুফ শাহ কর্তৃক নির্মিত হয়েছে।

মধ্যযুগীয় বাংলার বৈশিষ্ট্যধারী এই জামে মসজিদের ভেতরে ও বাইরে টেরাকোটা ফলক অলংকরণসহ ঈষৎ লাল বর্ণের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে এটি আচ্ছাদনবিহীন এবং সামনে একটি ভেঙে পড়া বারান্দা রয়েছে।

একসময় মসজিদের ওপরে সর্বমোট চারটি চৌচালা আচ্ছাদন ও ২৪টি গম্বুজ ছিল, যার সব কয়টি এখন নিশ্চিহ্ন। এই মসজিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো মূল কক্ষের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত রাজকীয় গ্যালারি (কখনো এটাকে ভুলভাবে মহিলা গ্যালারি বলেও বর্ণনা করা হয়েছে)। বাইরে থেকে প্রবেশের জন্য ছিল সিঁড়িযুক্ত মঞ্চ, যা সশস্ত্র প্রহরী দ্বারা সুরক্ষিত থাকত। মসজিদের উত্তরে একটি প্রবেশপথ ছিল, এখন সেটি ধ্বংসপ্রাপ্ত। বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকা পাথর থেকে এর অস্তিত্ব অনুমান করা যায়। প্রতি কোণে অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ নির্মাণ করে মসজিদকে মজবুত করা হয়েছিল; পূর্বেরগুলো এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত, শুধু ভিত্তির কিছু অংশ টিকে আছে।

এই মসজিদের অলংকরণ অত্যন্ত জমকালো। আনুভূমিকভাবে, ‘অফসেট’ ও ‘ইনসেট’ ও নকশার সাহায্যে বাইরের দেয়াল বিন্যস্ত। সঙ্গে রয়েছে পোড়ামাটির ফলকের প্যানেল, যার মধ্যে ঝুলন্ত মোটিফের প্রাধান্য রয়েছে। ভেতর দিকে খিলান ও পেন্ডেন্টিভগুলোতে ইটের গাঁথনির মাধ্যমে সজ্জিত করা হয়েছে।

মিহরাবগুলো প্রতিটি ‘বে’ বরাবর স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর খিলান লতাগুল্ম, পত্রসম্ভার, গোলাপ, চারাগাছ ও ঝুলন্ত নকশায় সজ্জিত পোড়ামাটির ফলকের ফ্রেমের মধ্যে স্থাপিত। খিলানগুলোর অলংকরণশৈলী গৌড়-লখনৌতির এ ধরনের অলংকরণশৈলীর অতি উৎকৃষ্ট নমুনা। এ পোড়ামাটির ফলকগুলো অন্যান্য উদাহরণের চেয়ে উন্নতমানের এবং এগুলোতে কিছুটা ঔজ্জ্বল্যের আবরণ থাকায় দেখতেও কিছুটা ভিন্ন ধরনের ও আকর্ষণীয়।

পশ্চিম দেয়ালটি টিকে আছে, এবং দক্ষিণ দিকের দেয়ালে সংস্কারের ফলে পোড়ামাটির ফলকের আসল রূপ নষ্ট হয়ে গেছে। মসজিদের বক্র কার্নিসে ধাবমান সারিতে পতাকার আকারে  পোড়ামাটির ফলক স্থাপনের মধ্যে একটি আকর্ষণীয় উদ্দেশ্য রয়েছে, যা ঘোষণা করে মসজিদের নির্মাতা ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রধান ও তৎকালীন আমিরুল মুমিনীন (বিশ্বাসীদের নেতা)।

একসময় দরসবাড়ি মসজিদ গৌড় লখনৌতির সুলতানি আমলের মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম সুন্দর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত ছিল। শহর স্থাপনের শুরুর দিকেই এটি নির্মিত হয়েছিল, অন্যান্য সমসাময়িক উদাহরণের মতো এটাও গৌড়ীয় রীতির অন্তর্ভুক্ত, যা পরে বাংলার অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং মধ্যযুগীয় স্বাধীন বাংলা রীতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

মন্তব্য