kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

ইসলামের প্রথম যুগে সম্পদের বণ্টন

ড. ইকবাল কবীর মোহন   

৬ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইসলামের প্রথম যুগে সম্পদের বণ্টন

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের আছে সুষ্ঠু ও সুন্দর নীতিমালা। অর্থনৈতিক জীবন পরিচালনা এবং সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায়ও ইসলামের আছে অনন্য নীতি। সম্পদ উৎপাদনের উপাদানগুলোর অবদান এবং সার্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সম্পদ বণ্টন হয়ে থাকে। জাতীয় পর্যায়ে আয়ের উৎস ও বণ্টননীতিতে ইসলাম অসাধারণ নীতি প্রণয়ন করেছে। প্রচলিত অর্থনীতিতে বণ্টন নীতির বিপরীতে ইসলাম বাস্তব এবং কার্যকর ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে। ইসলামের এই সুষম বণ্টননীতি ইসলামী অর্থনীতিতে অনন্য ও যুগোপযোগী নীতিগুলোর অন্যতম। ইসলামী অর্থনীতি স্বচ্ছ, সাবলীল এবং বাস্তবধর্মী। এতে কোনো প্রকার দুর্নীতি বা অসৎ উপায় অবলম্বনের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

অস্বচ্ছ ও বিবেচনাবহির্ভূত কোনো কাজই ইসলাম সমর্থন করে না। তাই পবিত্র কালামে পাকে সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না।’

সম্পদ শুধু কতিপয় ধনী মানুষের হাতে গিয়ে জমা হয়ে থাকুক—ইসলাম তা সমর্থন করে না। এ জন্য মহান আল্লাহ তাআলা সুরা হাশরের ৭ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন, ‘সম্পদ যেন তোমাদের কতিপয় ধনীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়।’

সম্পদ বণ্টনের বেলায় ইসলাম ব্যক্তির মেধা এবং শ্রমকে যথাযথ মূল্য দেয় এবং উৎপাদিত পণ্যের ওপর তার অধিকারকে স্বীকৃতি দান করে। সুরা জুখরুফের ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আমিই বণ্টন করে রেখেছি তাদের জীবিকা পার্থিব জীবনে তাদের মধ্যে এবং তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, যাতে একে অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারে।’

এসব আয়াতের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, সম্পদ যেন ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে এবং তা যেন গরিব-মিসকিনদের মধ্যেও আবর্তিত হয়। ইসলাম এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

মহানবী (সা.)-এর যুগে সম্পদ বণ্টন : রাসুল (সা)-এর যুগে সম্পদ বণ্টনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বদর যুদ্ধে লব্দ গণিমত বণ্টন। এই যুদ্ধে মালে গনিমত মুসলমানদের হস্তগত হয় এবং রাসুল (সা.) সেগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। অতঃপর কারদা যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গনিমতের সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়। কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী এর এক-পঞ্চমাংশ (২০ হাজার দিনার) মহানবী (সা.) গ্রহণ করেন এবং তা তিনি জনসাধারণের কল্যাণে ব্যয় করেন। বাকি চার-পঞ্চমাংশ তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বিলিয়ে দেন। এভাবে সম্পদ বণ্টনে সুন্দর নীতি চালু করেন মহানবী (সা.)।

আবু বকর (রা.)-এর যুগে সম্পদ বণ্টন : আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকালে সর্বপ্রথম বাহরাইনে গনিমতের সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়। রাসুল (সা.) যেসব লোকের সঙ্গে ওয়াদা করে গিয়েছিলেন আবু বকর (রা.) সর্বপ্রথম ওই সম্পদ থেকে তাদের দান করেন। খিলাফতের দ্বিতীয় বছরে আরো বেশি সম্পদ মূসলমানদের হস্তগত হয়। আবু বকর (রা.) সেগুলো সমানভাগে ভাগ করে দেন। এবার প্রত্যেক সাহাবির ভাগে পড়ল ২০ দিরহাম করে।

উমর (রা.)-এর সময় সম্পদ বণ্টন : আবু হুরায়রা (রা.) বাহরাইন থেকে পাঁচ লাখ দিরহাম নিয়ে মদিনায় আসেন। এই পরিমাণ ছিল অত্যন্ত বেশি। উমর (রা.) এগুলো যাদের প্রয়োজন তাদের মাঝে সময়মতো বণ্টন করেন। উমর (রা.) রাষ্ট্রের বায়তুলমাল থেকেও অর্থ-সম্পদ অত্যন্ত ন্যায়নীতির সঙ্গে প্রজাদের মধ্যে বণ্টন করতেন।

উসমান ও আলী (রা.)-এর সময়ে সম্পদ বণ্টন : এই দুই খেলাফতকালেও সম্পদ বণ্টনের বেলায় কোনো হেরফের হয়নি। আগের দুই খলিফার পথ অনুসরণ করে তাঁরাও সম্পদ সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করেন। তখন সম্পদ বণ্টনের বেলায় কোনো ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। 

মহানবী (সা.)-এর প্রবর্তিত নীতি অনুসরণ করে খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে সাম্যনীতি বহাল ছিল। পরবর্তী মুসলিম শাসনামলেও ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার দৃষ্টান্ত দেখা যায়।

লেখক : সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক। বর্তমানে কো-অর্ডিনেটর, ইসলামী ব্যাংকিং কনভারশন প্রজেক্ট, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড।

মন্তব্য