kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বিশুদ্ধ মাতৃভাষা চর্চায় মহানবী (সা.)

মুফতি সাইফুল ইসলাম   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বিশুদ্ধ মাতৃভাষা চর্চায় মহানবী (সা.)

মনুষ্যপরিচয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ভাষা। মহান আল্লাহ তাঁর নবীদের পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ভাষা দিয়ে পাঠিয়েছেন। কেননা সব ভাষাই আল্লাহর দান ও তাঁর কুদরতের নিদর্শন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তার নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রোম, আয়াত : ২২)

দুনিয়াতে যত নবী-রাসুল এসেছেন সবাই বিশুদ্ধ মাতৃভাষায় কথা বলতেন। মায়ের ভাষায় ইসলামের দাওয়াত দিতেন। মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন। মাতৃভাষাকে তাঁরা অনেক বেশি ভালোবাসতেন। কারণ মাতৃভাষা মহান আল্লাহর এক বড় নিয়ামত ও অপূর্ব দান।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘দয়াময় আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। সৃজন করেছেন মানুষ। শিক্ষা দিয়েছেন ভাষা তথা বর্ণনা।’ (সুরা : আর রহমান, আয়াত : ১-৪)

মহানবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন ‘আফসাহুল আরব’ বা আরবের শ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধভাষী। আরবি শুধু দ্বিনি ভাষা-ই নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক জনপদের বাসিন্দাদের মাতৃভাষাও বটে। মহানবী (সা.) বিশুদ্ধ ভাষার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় সাহাবায়ে কেরামকে ভাষার শাব্দিক ব্যবহারে সচেতন করতেন।

একবার এক সাহাবি রাসুল (সা.)-এর কাছে এলেন। তিনি বাইরে থেকে সালাম দিয়ে বলেন, ‘আ-আলিজু?’ (আমি কি প্রবেশ করব?) ঢোকা অর্থে এই শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় আছে; কিন্তু অনুমতি প্রার্থনার ক্ষেত্রে তা প্রমিত শব্দ নয়। প্রমিত শব্দ হচ্ছে, ‘আ-আদখুলু?’ তখন নবী (সা.) বলেন, তুমি ‘আ-আদখুলু?’ বলো। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৭৯)

এভাবে তাঁর শব্দ-প্রয়োগ ঠিক করে দিয়েছেন। অথচ তা জিকির-আজকার বা এ জাতীয় কোনো বিষয় ছিল না। সহিহ মুসলিম এই একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ই আছে ‘কিতাবুল আলফাজ’ শিরোনামে। সেখানে বিভিন্ন হাদিসে আমরা দেখতে পাই নবী (সা.) শব্দ প্রয়োগ সংশোধন করেছেন, এশার নামাজকে ‘আতামা’ বলো না, ‘এশা’ বলো। আঙুরকে ‘করম’ বলো না, ‘ইনাব’ বলো ইত্যাদি।

মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বায় ‘কিতাবুল আদব’-এর একটি শিরোনাম হলো, ‘মান কানা ইউয়াল্লিমুহুম ওয়াদরিবুহুম আলাল লাহনি’ অর্থাৎ সন্তানকে ভাষা শিক্ষা দেওয়া এবং ভুল হলে শাসন করা প্রসঙ্গ। এই পরিচ্ছেদে সহিহ সনদে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে কথাবার্তায় লাহন বা ভাষাগত ভুল হলে তিনি সন্তানদের শাসন করতেন।

এ থেকে বোঝা যায় যে দৈনন্দিন জীবনেও একজন মুমিনের ভাষা বিশুদ্ধ ও শালীন হতে হবে। এটা দ্বিনি ভাষার প্রসঙ্গ নয়, মাতৃভাষার প্রসঙ্গ। অতএব মাতৃভাষা যা-ই হোক, তার বিশুদ্ধতা শরিয়তের কাম্য। আর এটা কখনো চর্চা ছাড়া হাসিল হবে না। যুগে যুগে মহান আল্লাহ তাঁর নবী-রাসুলদের স্বজাতির ভাষায় পারদর্শিতা দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তাঁরা তাঁদের উম্মতদের সহজে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিতে পারেন। উম্মতরা তাঁদের কথা বুঝতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি রাসুলদের তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের (দ্বিন) স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪)

তাই আসুন, আমরা সবাই মহান আল্লাহর এই আদেশ পরিপূর্ণভাবে পালন করার জন্য কোরআন-হাদিসের জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষাচর্চায় মনোযোগী হই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক :  প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও মুহাদ্দিস

[email protected]

 

 



সাতদিনের সেরা