kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

নবীজির শৈশবের দিনগুলো

আতাউর রহমান খসরু   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নবীজির শৈশবের দিনগুলো

পরিবারের সীমাহীন স্নেহ ও মমতার ভেতর দিয়ে বড় হলেও অন্য সব শিশুর মতো মহানবী (সা.)-এর শৈশব আনন্দমুখর ছিল না। আল্লাহ তাঁকে নানা দুঃখ-কষ্ট ও পরীক্ষার ভেতর দিয়ে আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত করছিলেন। মূলত তিনি পৃথিবীর কোনো মানুষের পরিবর্তে তাঁকে নিজ তত্ত্বাবধানে প্রতিপালন করতে চেয়েছিলেন। জন্মের আগেই মহানবী (সা.)-এর বাবা মারা যান। ছয় বছর বয়সে মাকে এবং আট বছর বয়সে দাদাকে হারান। তাঁদের মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁর অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন। সামাজিক মর্যাদা ও বংশীয় আভিজাত্যের অধিকারী হলেও আবু তালিবের সংসারে অভাব-অনটন ছিল।

জন্মের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) চার-পাঁচ বছর দুধ মা হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে ছিলেন। দুই বছর পূর্ণ হলে দুধ ছাড়ানো হয় এবং মক্কায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু নবীজি (সা.)-এর অবস্থানের কারণে জীবন ও পরিবারে যে বরকত দেখা দিয়েছিল তা হারানোর ভয়ে হালিমা সাদিয়া (রা.) তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যান। অজুহাত হিসেবে মা আমিনাকে বলেন, আমি মুহাম্মদের ব্যাপারে মক্কার চলমান মহামারি আশঙ্কা করছি। এর কয়েক মাস পর বক্ষ বিদারণের ঘটনা ঘটলে ভয়ে তাঁকে ফিরিয়ে দিয়ে যান। (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ৭৩)

প্রথম বাক্য

হালিমা (রা.)-এর বর্ণনা মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম বাক্য ছিল ‘আল্লাহু আকবর কাবিরা, ওয়াল হামদুলিল্লাহি হামদান কাসিরা, ওয়া সুবহানাল্লাহি বুকরাতাও-ওয়া আসিলা’। (খাসাইসে কুবরা : ১/৫৫)

ভাষার বিশুদ্ধতা

যে বয়সে শিশুরা ভাষা রপ্ত করে সে সময়টুকু রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু সাদে দুধ মায়ের কাছে কাটিয়েছেন। আর আরবে বনু সাদের ভাষাগত দক্ষতা ও অলংকার, উচ্চমান ও শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি ছিল। তিনি কখনো কখনো তাঁর সাহাবিদের বলতেন, ‘আমি তোমাদের তুলনায় বেশি আরব কোরাইশি এবং আমি সাদ ইবনে বকর গোত্রের দুধ পান করেছি।’ (নবীয়ে রহমত, পৃষ্ঠা ১১৪)

শারীরিক গঠন

হালিমা সাদিয়া (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.)-এর দৈহিক ক্রমবিকাশ অন্যান্য শিশুর তুলনায় উন্নত ছিল। এমনকি দুই বছরেই তাঁকে বেশ বড়সড় দেখাত।’ (সিরাতে খাতুল আম্বিয়া, পৃষ্ঠা ৭)

খেলাধুলা

হাঁটাচলার বয়স হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘর থেকে বের হতেন। শিশুদের খেলা দেখতেন। কিন্তু অংশগ্রহণ করতেন না। কখনো কখনো তাঁকে অন্যমনস্ক ও ধ্যানমগ্ন বলে মনে হতো। (প্রাগুক্ত)

বকরি চরান

দুধ মা হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে থাকতেই দুধ ভাই আবদুল্লাহর দেখাদেখি বকরি চড়াতে যান রাসুলুল্লাহ (সা.)। আল্লামা মানাজির আহসান গিলানি (রহ.) দাবি করেন, মক্কায় ফিরে আসার পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) অর্থের বিনিময়ে অন্যের উট ও বকরি চরাতেন এবং চাচা আবু তালিবের সাংসারিক খরচ নির্বাহে সহযোগিতা করতেন।

বকরি চরানোর সময়ও তিনি অন্য রাখালদের সঙ্গে খেলাধুলা করার পরিবর্তে একাকী সময় কাটাতেন। (আন-নাবিয়্যুল খাতিম, পৃষ্ঠা ৫৯; সিরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৪১)

আত্মমর্যাদাবোধ

আল্লামা ইবনে হিশাম (রহ.) বর্ণিত এক ঘটনা থেকে মহানবী (সা.)-এর উচ্চ আত্মমর্যাদা বোধ ও নেতৃত্বসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়। তিনি লেখেন, “আবদুল মুত্তালিবের জন্য পবিত্র কাবার ছায়ায় চাদর বিছানো হতো।

আবদুল মুত্তালিব সেখানে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত ওই চাদরের আশপাশে বসে থাকত তাঁর পুত্র-পৌত্ররা। আবদুল মুত্তালিবের সম্মানার্থে কেউ তাঁর ওপরে বসত না। কিন্তু দৃঢ়চেতা কিশোর মুহাম্মদ (সা.) এসেই বিছানার ওপর গিয়ে বসে পড়তেন। তাঁর চাচা তাঁকে ধরে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করতেন। তা দেখে আবদুল মুত্তালিব বলতেন, ‘তোমরা আমার পৌত্রকে বাধা দিয়ো না। আল্লাহর কসম, সে এক অসাধারণ ছেলে।” (সিরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৪৩)

মেঘমালার ছায়া দান

হালিমা সাদিয়া (রা.) বলেন, রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলে তিনি দেখতে পেতেন ঘরে চাল সরে গেছে এবং চাঁদ নেমে এসেছে। (যেন) তাঁর সঙ্গে সে কথা বলছে।

এমনিভাবে তিনি যখন মাঠে পশু চরাতেন মেঘমালা তাঁর মাথার ওপর ছায়া দিত। (সিরাতুন-নাবিয়্যিল মুখতার,

পৃষ্ঠা ১১০; আন-নাবিয়্যুল খাতিম, পৃষ্ঠা ৬০)

স্নেহশীল কয়েকজন নারী-পুরুষ

শৈশবে রাসুলুল্লাহ (সা.) কয়েকজন নারী ও পুরুষের বিশেষ স্নেহ পেয়েছিলেন, যাঁদের কোলে-পিঠে তিনি বড় হয়েছেন।

তাঁরা হলেন—মা আমিনা, দুধ মা হালিমা, দুধ মা সুওয়াইবা, দুধ বোন শায়মা, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দাসী উম্মে আয়মান, দাদা আবদুল মুত্তালিব, চাচা আবু তালিব প্রমুখ। (জাদুল মাআদ, পৃষ্ঠা ২৭)

 



সাতদিনের সেরা