kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

নাজ্জাশি বাদশাহর দরবারে জাফর (রা.)-এর ভাষণ

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মক্কার কাফিরদের জুলুম-নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে জাফর তাইয়্যারের (রা.) নেতৃত্বে মুহাজিরদের দ্বিতীয় দল যখন ইথিওপিয়ায়  উপনীত হয়, তখন মক্কার কাফিরদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নাজ্জাশির দরবারে উপস্থিত হয়ে এ মর্মে আর্জি পেশ করে যে মক্কার একদল ধর্মত্যাগী বিদ্রোহী পালিয়ে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের আমাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। মক্কাবাসীদের এ আর্জির পরিপ্রেক্ষিতে মহামতি নাজ্জাশি মুহাজির নেতা জাফর (রা.)-কে দরবারে তলব করে তাঁদের ঈমান-আকিদা সম্পর্কে যে বক্তব্য দেন, তাতে সংক্ষিপ্তভাবে ইসলামের মর্মবাণী ফুটে উঠেছে। এখানে তা উপস্থাপন করা হলো—

জাফর (রা.) বলেন,

মহামতি বাদশাহ, আমরা ছিলাম মূর্খ জনগোষ্ঠী। নিজ হাতে গড়া কৃত্রিম দেব-দেবীর উপাসনা-অর্চনা ছিল আমাদের ধর্মীয় রীতি। মৃত ভক্ষণ, ব্যভিচার ও নৃশংসতা আমাদের সামাজিক রীতি-নীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছিল। আমরা প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে যেমন অবহিত ছিলাম না, তেমনি দয়ামায়া, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহমর্মিতার শিক্ষা থেকেও ছিলাম অপরিচিত। শক্তিমানরা অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের গিলে খাওয়াটাকেই বীরত্ব ও গর্ব করার মতো বিষয় বলে মনে করত। এটাই ছিল আমাদের জাতীয় জীবনদৃষ্টি। আমাদের এ দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা দীর্ঘকাল ধরেই চলে আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেন। তিনি আমাদের মধ্যে এমন একজন নবী প্রেরণ করেন, যাঁর বংশমর্যাদা সম্পর্কে আমরা অবগত। যাঁর সততা ও সত্যবাদিতা আমাদের কাছে অত্যন্ত সুস্পষ্ট। যাঁর উন্নত নৈতিক চরিত্র ও পবিত্রতা আমাদের দৃষ্টির সামনেই আছে। তাঁর শুভাগমন হয়েছে এবং তিনি আমাদের পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাদের সামনে হিদায়াতের এমন এক উজ্জ্বল মশাল তুলে ধরলেন, যার আলোকচ্ছটা মূর্খতা, দুষ্কৃতি ও অনাচারের সব পর্দা আমাদের দৃষ্টিসীমা থেকে অপসারিত করেছে।

তিনি বলেন যে তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো, একমাত্র তাঁকেই নিজেদের সৃষ্টিকর্তা এবং প্রভু হিসেবে গ্রহণ করো। মূর্তিপূজা ত্যাগ করো। এসব হাতে গড়া উপাস্য তোমাদের কোনো উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা রাখে না। পথভ্রষ্টতার মূল ভিত্তি হচ্ছে পিতৃ-পিতামহের ভ্রান্ত আচার-আচরণের অনুকরণ।

তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, সর্বাবস্থায় সত্য বলবে। আমানত বিনষ্ট করবে না। বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না। প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ ও সহমর্মিতার ব্যবহারকে চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত করে রাখবে। রক্তপাত ও সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক অবৈধ করা বিষয়াদি থেকে বিরত থাকবে। অশ্লীলতা ও মিথ্যার নিকটবর্তী হয়ো না। এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করবে না। কোনো নিরাপরাধ নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ কোরো না। এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং অর্জিত সম্পদ থেকে অসহায়-গরিবকে অংশ দাও।

মহান বাদশাহ, ওই নবী আমাদের এ ধরনের আরো অনেক ভালো বিষয়ে শিক্ষাদান করেছেন। আমরা তাঁর প্রতিটি বাক্য পরমসত্য বলে গ্রহণ করেছি। তাঁকে আল্লাহর নবী হিসেবে মেনে নিয়েছি। তিনি যেসব আসমানি আদেশ-নিষেধ আমাদের শুনিয়েছেন, সেসব অনুসরণ করছি। আমরা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করেছি। সব ধরনের শিরক থেকে তাওবা করেছি। তাঁর নির্দেশিত হালালকে হালাল বলে মেনেছি এবং হারামকে হারাম বলে পরিত্যাগ করেছি।

এতটুকুই আমাদের অপরাধ! এর পরিণতিতে স্বদেশবাসীরা আমাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে চলে আসতে বাধ্য করেছে। আর শেষ পর্যন্ত আমরা আপনার দেশে আশ্রয় নিয়েছি।’

জাফর তাইয়্যার (রা.)-এর দীর্ঘ বক্তব্য ইথিওপিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশিকে এতই মুগ্ধ করেছিল যে তিনি মক্কা থেকে আগত প্রতিনিধিদের স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন, এমন পবিত্র বিশ্বাস পোষণকারী লোকদের ফেরত দিয়ে জুলুমের শিকার হতে কখনো দিতে পারি না। (মুসনাদে আহমদ, প্রথম খণ্ড; সিরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড)।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা