kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ইসলামে মানবসম্পদের সুন্দর ব্যবস্থাপনা

ড. মুহাম্মাদ মোহন মিয়া   

৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইসলামে মানবসম্পদের সুন্দর ব্যবস্থাপনা

ব্যবস্থাপনা বা উন্নয়ন অনেক পুরনো বিষয়। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে ব্যবস্থাপনার শুরু। আদিকালে খাদ্য জোগাড়ের সামষ্টিক প্রচেষ্টা থেকে মূলত ব্যবস্থাপনার সূচনা। কালের পরিক্রমায় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বিষয়ে নানা বিবর্তন এসেছে। ব্যবস্থাপনা এখন আর পরিকল্পনা, সংগঠন, পরিচালনা, প্রেষণা বা সমন্বয়ের মধ্যে সীমিত নেই। তবে ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতার যতই ছোঁয়া লাগুক না কেন, এর ন্যূনতম শর্তে আমূল কোনো পরিবর্তন হয়নি। ন্যূনতম সম্পদ ব্যবহার করে সর্বাধিক ফল নিশ্চিত করা ব্যবস্থাপনার একটি অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। মানবসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ হতে পারে।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার যত কলাকৌশলই অবলম্বন করা হোক না কেন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নৈতিকতার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। নৈতিকতা বা মূল্যবোধ হলো ব্যক্তির মৌল চেতনা বা মৌল বিশ্বাস, যা দীর্ঘদিন থেকে ব্যক্তির মধ্যে লালিত হয়ে আসছে। মূল্যবোধ ব্যক্তির চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস, অনুভূতি ও ভাবাবেগকে প্রভাবিত করে। মানব আচরণের ওপর মূল্যবোধের ব্যাপক প্রভাব বিদ্যমান। মানুষ দেশের আইন-কানুন অমান্য করা বা ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পেলেও মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এ কাজে বাধা দেয়। ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ইসলাম সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। যেমন—

ভ্রাতৃত্ববোধ : মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভ্রাতৃত্ববোধের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রাতৃত্ববোধ মানবজাতির মৌলিক ঐক্যের মূল ভিত্তি। কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মী বাহিনীর মধ্যে সৃদৃঢ় ভ্রাতৃত্ববোধ বিদ্যমান থাকলে জনবলের ভেতর সম্প্রীতি ও মমত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। ফলে ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য সর্বোচ্চ সার্ভিস অর্জিত হতে কষ্ট হয় না। এ জন্য ইসলাম এই বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম ভাই ভাই।’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ১০)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সংকটাপন্ন ব্যক্তির সংকট নিরসন করবে, আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় সংকট নিরসন করে দেবেন।’

কল্যাণ কামনা : মানুষের জন্য ভালো কিছু করা বা তার কল্যাণ করা একটা উন্নত সমাজব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য। ইসলাম কল্যাণের ও কল্যাণ কামনার ধর্ম। আর এই কল্যাণ কামনা মানবসমাজেরও অন্যতম উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে ভালোবাসা প্রদর্শন ও দরদি মনোভাব পোষণ করার ফলেই সমাজ হয়ে ওঠে সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও কল্যাণকর। এই বিষয়ে কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, মুসাফিরদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কল্যাণকামিতা হলো দ্বিন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৫)

সুবিচার : সমাজ থেকে জুলুম বা অন্যায়ের অবসান ইসলামী জীবনব্যবস্থার আরেকটি উদ্দেশ্য। ব্যবস্থাপনায় সুবিচার হলো সবার হক প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা। এর দ্বারা পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সুবিচারের প্রয়োগ অপরিহার্য। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সুবিচার করবে; এটা তাকওয়ার নিকটতর।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৮)

মহানবী (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে পরাক্রমশালী মহান আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটবর্তী আসনে আসীন হবেন ন্যায়পরায়ণ শাসক।’ তাই সুবিচার বা সবার প্রতি সমান আচরণ পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের জনবলকে নিষ্ঠাবান করে তোলে। সেখানে ক্ষোভ ও বিরোধ থাকে না। ফলে সবাই মিলে সর্বোচ্চ কর্মফল অর্জন করা সম্ভব হয়।

অন্যের অধিকার সংরক্ষণ : অন্যের অধিকার সংরক্ষণ জনবল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় একটি বিষয়। এই চেতনা বা গুণ মানুষকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে। ফলে বেড়ে যায় কর্মপ্রেরণা ও উদ্যম। আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তোমরা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪৮)

এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কাজেই প্রত্যেক হকদারকে তার ন্যায্য অধিকার দিয়ে দাও।’ (বুখারি)

বিশ্বস্ততা : মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বস্ততা অন্যতম। এটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকারী ও নিয়োজিত—উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার বন্ধন রচনা করে। ফলে ব্যবস্থাপনায় আসে গতি। বেড়ে যায় কর্মদক্ষতা। আর এর ফলাফল হয় চমৎকার। পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের পরিবেশ মানুষের জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদিতা পুণ্যের দিকে নিয়ে যায়, আর পুণ্য জান্নাতের দিকে নেয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)

সদাচরণ : মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য সদাচরণ অত্যাবশ্যক। আখলাকে হাসানা অর্জন জরুরি। সদাচরণের মাধ্যমে সহজে মানুষকে আকৃষ্ট করা যায়, মানুষের মন জয় করা যায় সহজে। এতে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য সহজেই অর্জিত হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনদের মধ্যে উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী তারাই, যারা সুন্দর চরিত্রের অধিকারী।’

একদল সুন্দর ও চরিত্রবান মানুষের ব্যবস্থাপনা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সুফল বয়ে আনে।

প্রেষণা : মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রেষণা বা উদ্বুদ্ধকরণ অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। লোকজন যদি উৎসাহী ও উদ্বুদ্ধ না হয়, তাহলে কোনো কাজেই সফলতা আসে না। প্রেষণার কারণেই মানুষ তার সর্বোচ্চ দক্ষতা ও সামর্থ্য কাজে লাগাতে সক্ষম হয়। এর ফলে সহজেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভ করা যায় এবং ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য অর্জিত হয়।

চুক্তি পালন : মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হলো চুক্তি পালন বা অঙ্গীকার রক্ষা করা। এ জন্য ইসলাম বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা প্রতিশ্রুতি পালন করবে।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৪)

মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না দ্বিন-ইসলামে তার কোনো অংশ নেই।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ১২৫৬৭)

মানুষ তার প্রতিশ্রুত দায়িত্ব পালন করলে যেকোনো কাজ সহজ হয়। ফলে সফলতা অর্জন সম্ভব হয়। এতে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য তা সহজেই হাসিল করা যায়।

নিরাপত্তা : প্রতিটি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রত্যেকের সম্মানজনক ও মানবিক মূল্যবোধের নিরাপত্তা এবং জীবনমানের নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। সমাজের সব পর্যায়ের মানুষের পরম আকাঙ্ক্ষা হলো নিরাপত্তার গ্যারান্টি। একটা সমাজের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য নিরাপত্তা বিষয়টি একটা মৌলিক বিষয়। মানুষ নিজে বা রাষ্ট্রে নিরাপদ আছে বলে মনে না করলে তার উদ্যম ও চেতনার বিলুপ্তি ঘটে। ফলে তার দ্বারা কিছু অর্জন করা সম্ভব হয় না। সে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তখন সমাজে কোনো উন্নয়ন ঘটে না।

মানবজাতির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্দর ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রেষণা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মানুষ যদি ইসলামের নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত ও উদ্বুদ্ধ হয় তাহলে সে সমকালীন অনেক সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে। ইসলামী নীতির আলোকে যেকোনো ক্ষেত্রে সুন্দর ব্যবস্থাপনা করা গেলে একটি উন্নত ও কাঙ্ক্ষিত সমাজ বা রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : কো-অর্ডিনেটর, ইসলামী ব্যাংকিং করভারশন প্রজেক্ট, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড ও সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা