kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সত্য বলা উত্তম ইবাদত

মুফতি ইবরাহিম সুলতান   

৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইসলাম শান্তির বার্তা নিয়ে দুনিয়ায় আবির্ভাব করেছে। জাহেলি যুগের ঘোর অন্ধকার থেকে বিশ্বকে দেখিয়েছে আলোর পথ। কাজ করেছে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য, যার মূল সূত্র ছিল সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান। কারণ যে সমাজে এ মহৎ কাজের চর্চা যত বেশি হয়, উন্নতি ও সাফল্যে সেই সমাজ তত বেশি অগ্রগণ্য থাকে। কোরআনে একে মানবজাতির কল্যাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তা ছাড়া এ জাতির শ্রেষ্ঠত্ব নিহত এই কল্যাণমূলক কাজে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১১০)

এই আদর্শিক আহ্বানের সঙ্গে ঈমানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অবস্থাভেদে ঈমানের ভিন্ন ভিন্ন স্তর নির্ধারিত হয় এই কাজে। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের কেউ গর্হিত কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগে) পরিবর্তন করে দেয়। যদি তার সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (প্রতিবাদ) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা ঘৃণা বা পরিকল্পনা করবে, তবে এটা ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক।’ (মুসলিম, হাদিস : ৮১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম সংগ্রাম হলো কোনো জালিম শাসকের মুখের ওপর সত্য কথা বলে দেওয়া।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১১১৪৩)

আগের অনেক মনীষী ক্ষমতাধর শাসকদের সামনে সত্য কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন। নিচে এমনই এক সত্যবাদী সাহসী মনীষীর ঘটনা তুলে ধরা হলো।

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, আমার চাচা মুহাম্মাদ ইবনে আলী আমাকে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘একবার আমি আমিরুল মুমিনিন (খলিফা) আবু জাফর মানসুরের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। ইবনে আবি জুআইব এবং খলিফার শাসনকর্তা ইবনে জায়েদও সে সময় উপস্থিত ছিলেন। সেই মুহূর্তে দরবারে গিফার গোত্রের লোকেরা খলিফা আবু জাফরের কাছে হাসান ইবনে জায়েদের কোনো কাজের ব্যাপারে অভিযোগ উত্থাপন করল।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাসান বলেন, আমিরুল মুমিনিন! আপনি এদের সম্বন্ধে ইবনে আবি জুআইবকে জিজ্ঞাসা করুন। খলিফা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু জুআইব! তাদের সম্বন্ধে আপনি কী বলেন? উত্তরে তিনি বলেন, আমি নিশ্চয়তার সঙ্গে বলছি, তারা মানুষের মান মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং তাদের অনেক কষ্ট দেয়। এ কথা শুনে খলিফা গিফার গোত্রের লোকদের বলেন, তোমরা তোমাদের নিজেদের সম্বন্ধে শুনলে তো? খলিফার জবাবে তারা বলল, আমিরুল মুমিনিন! তাহলে আপনি ইবনে জায়েদ সম্পর্কেও তাকে জিজ্ঞাসা করুন! খলিফা তাকে হাসান ইবনে জায়েদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে আবু জুআইব বললেন, ‘আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, সে ন্যায়ের পরিপন্থী আদেশ-নির্দেশ দেয় এবং স্বেচ্ছাচারী মনোভাব লালন করে।’ এ কথা শুনে খলিফা হাসানকে বলেন, আবু মুসআব তোমার সম্পর্কে যা বলেন তা তো তুমি শুনলে। তিনি তো একজন পুণ্যবান শায়খ, তিনি মিথ্যা বলতে পারেন না। খলিফার কথা শুনে হাসান বলল, আচ্ছা আপনি তাকে আপনার নিজের সম্পর্কে জিজ্ঞাস করুন তো! এ কথা বলতেই খলিফা বলেন, আবু মুসআব! সত্যি করে বলুন, আমার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী? তিনি বলেন, আমিরুল মুমিনিন! আমাকে মাফ করবেন। আমি আপনার সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না! খলিফা তখন আল্লাহর কসম দিয়ে বলেন, আপনাকে বলতেই হবে। আবু মুসআব তখন বলেন, আল্লাহর কসম দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন! অথচ নিজের সম্পর্কে আপনি নিজেই তো ভালো জানেন। খলিফা তার পরও বলেন, দোহাই আল্লাহর! আপনাকে বলতেই হবে। তখন আবু মুসআব (রহ.) বলেন, ‘আমি খুব দৃঢ়ভাবে বলছি, আপনি রাজদরবারের এসব সম্পদ অন্যায় পন্থায় দখল করে তা অযোগ্য পাত্রে অর্পণ করেছেন এবং আপনার রাজ্যে দুর্নীতি প্রবলভাবে গ্রাস করে ফেলেছে।’ খলিফা তখন রাগ হয়ে নিজের আসন থেকে উঠে এসে আবু মুসআবের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘কসম আল্লাহর! শুনুন! আমি খলিফার মসনদে আসীন না থাকলে পারসিক, রোমান, দায়লামা ও তুর্কিরা আপনার এ স্থানটিও দখল করে নিত!’ উত্তরে ইবনে আবু মুসআব বললেন, ‘আমিরুল মুমিনিন! আপনার এ কথা মোটেও সঠিক নয়। কেননা ইসলামের প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফা আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-ও এ শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা ন্যায়কে ধারণ করেছিলেন এবং সাম্য ও ইনসাফের সঙ্গে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। এর পরও পারস্য ও রোমের গ্রীবা চেপে ধরেছিলেন এবং তাদের নাক নিচু করে অহমিকা চূর্ণ করে দিয়েছিলেন।’

খলিফা তখন তাঁর ঘাড় ছেড়ে দিয়ে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিলেন, আর বলেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি আমি এ সত্য না জানতাম যে আপনি সত্যবাদী তবে অবশ্যই আপনাকে হত্যা করতাম। তখন আবু মুসআব বলেন, আমিরুল মুমিনিন! আমি অবশ্যই আপনার জন্য আপনার সন্তান মাহদির চেয়েও অধিক কল্যাণকামী। সুতরাং যা বলেছি তা সবই সঠিক।’ (ইয়াহইয়াউ উলুমুদ্দিন ২/৩৪৭-৪৮)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা