kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

উহুদ যুদ্ধে নারী সাহাবিদের ত্যাগ

সাইফুল ইসলাম তাওহিদ   

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তৃতীয় হিজরিতে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে ৭০ জন সাহাবি শহীদ হন। আহত হন অসংখ্য সাহাবি। এই যুদ্ধে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও অংশগ্রহণ করেন। উহুদ যুদ্ধে নারীদেরও আছে উল্লেখযোগ্য অবদান ও ত্যাগ-তিতিক্ষার ইতিহাস। এ যুদ্ধে তাদের ঈমানদীপ্ত ঘটনা ফুটে উঠেছে। নারী সাহাবিদের কীর্তিগাথা চির ভাস্বর হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। আর তাতে সব যুগের নারীদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ আছে।

সাফিয়্যাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিবের ধৈর্য : তিনি রাসুল (সা.)-এর ফুফু। যাঁর শিরায় শিরায় বয়ে যেত ঈমানি চেতনা। জুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.) বর্ণনা করেন, উহুদ যুদ্ধের দিন এক নারী নিহতদের দেখার জন্য দৌড়ে আসছিল। নারীরা নিহতদের দেখবে তা রাসুল (সা.)-এর অপছন্দ ছিল। তিনি বলেন, এই নারীকে বাধা দাও। কিছুক্ষণ পর দেখি, তিনি আমার মা সাফিয়্যাহ। আমি তাকে বাধা দিলে তিনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে বললেন, ছাড়ো আমাকে! দূর হও এখান থেকে। আমি বললাম, রাসুল (সা.) আপনাকে নিহতদের দেখতে নিষেধ করেছেন। তখন তিনি থেমে গেলেন। রাসুল (সা.)-সাফিয়্যাহ (রা.)-কে হামজার কাছে যেতে বারণ করেন। কারণ মুশরিকরা তাঁর মৃতদেহ বিকৃত করেছিল। আর তা দেখলে সাফিয়্যাহ কষ্ট পাবেন। রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ শুনে সাফিয়্যাহও (রা.) থেমে গেলেন। আর সামনে আগাননি। এতে তিনি ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। নিজের আবেগ ও অনুভূতির ওপর রাসুল (সা.) এর আদেশ মান্য করাকে প্রধান্য দিয়েছেন। যা এই সঙ্গীন মুহূর্তে খুবই কষ্টকর।

কাবশা বিনতে রাফের নবীপ্রেম : প্রসিদ্ধ সিরাত বিশেষজ্ঞ ওয়াকেদি বর্ণনা করেন, উহুদ যুদ্ধের দিন সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-এর মা রাসুল (সা.)-এর কাছে দৌড়ে আসেন। তখন সাদ (রা.) রাসুল (সা.)-এর ঘোড়ার লাগাম ধরে রাখেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, ইনি তো আমার মা। তখন রাসুল (সা.) মারহাবা বলেন। মুয়াজের মা রাসুল (সা.)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনাকে নিরাপদে দেখে আমার সব বিপদ হালকা হয়ে গেল। রাসুল (সা.) তাঁর ছেলে আমর ইবনে মুয়াজ ব্যাপারে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘হে উম্মে সাদ, তুমি খুশি হও এবং শহীদদের পরিবারের লোকজনকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও যে শহীদরা জান্নাতে সবাই এক সঙ্গে রয়েছে। আর তাদের পরিবারের ব্যাপারে  তাদের সুপারিশ কবুল হবে।’ তারা বলল, আমরা সন্তুষ্ট। এমন সুসংবাদ শুনে কান্না করবে। অতঃপর তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তাদের উত্তরাধিকারীদের জন্যও দোয়া করুন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, তাদের অন্তরের দুঃখসমূহ দূর করে দিন, তাদের বিপদের বিনিময় প্রদান করুন এবং জীবিত ওয়ারিশদের উত্তম প্রতিদান দিন।’ (আস সিরাহ আল হালবিয়্যাহ : ২/৪৭)

নবীজির প্রতি বিধবা নারীর ভালোবাসা : দিনার গোত্রের এক মহিলার স্বামী, ভাই ও পিতা এ তিনজনই শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেছিলেন। তাঁকে এদের শাহাদাতের সংবাদ দেওয়া হলে তিনি বলে ওঠেন, রাসুল (সা.)-এর খবর কী? সাহাবিরা উত্তর দেন, ‘হে উম্মে ফুলান, তুমি যেমন চাচ্ছ তিনি তেমনই আছেন অর্থাৎ তিনি বেঁচে আছেন। মহিলাটি বললেন, তাঁকে একটু আমাকে দেখিয়ে দিন, আমি তাঁকে একটু দেখতে চাই। সাহাবিরা ইঙ্গিতে রাসুল (সা.)-কে দেখিয়ে দিলেন। রাসুল (সা.)-এর প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ামাত্রই হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, আপনাকে পেলে সব বিপদই নগণ্য। (ইবনে হিশাম : ২/৯৯)

আহতদের পানি দেন নারী সাহাবিরা : আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদের যুদ্ধে সাহাবিরা রাসুল (সা.) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। আমি দেখলাম, আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.) ও উম্মে সুলাইম (রা.) তাঁদের আঁচল এতটুকু উঠিয়ে নিয়েছেন যে আমি তাঁদের উভয় পায়ের গহনা দেখছিলাম। তাঁরা উভয়েই মশক পিঠে করে সাহাবিদের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন। আবার ফিরে গিয়ে মশক ভর্তি করে নিয়ে এসে সাহাবীদের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন। (বুখারি, হাদিস : ২৮৮০)

এ ছাড়া আরো অনেক নারী সাহাবি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। তাঁদের উল্লেখযোগ্য হলেন, উম্মে সুলাইম, উম্মে আম্মারা, রুবাইয়ি বিনতে মুআজ প্রমুখ। তাঁরা আহতদের চিকিৎসা ও সেবার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। উহুদ যুদ্ধে নারী সাহাবিরা যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পেশ করেন তা সত্যিকারার্থে চির স্মরণীয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা