kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ফিরে দেখা

মধ্যযুগের সর্বাধিক প্রভাবশালী দরবেশ নূর কুতুব আলম (রহ.)

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মধ্যযুগের সর্বাধিক প্রভাবশালী দরবেশ নূর কুতুব আলম (রহ.)

রাজা গণেশ নামক একজন হিন্দু শাসক ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দে ইলিয়াস শাহি বংশ উত্খাত করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি মুসলমানের ওপর নজিরবিহীন জুলুম-নির্যাতন শুরু করেন। এমনকি শায়খ ও আলেমদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার শুরু করেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে পড়ে যে শায়খ নূর কুতুব আলম (রহ.) হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন। তিনি জৌনপুরের সুলতান ইবরাহিম শর্কিকে বাংলা আক্রমণ করে বাংলাকে গণেশের হাত থেকে রক্ষা করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লেখেন। সুলতান ইবরাহিম শর্কি এই অনুরোধ রক্ষা করে বাংলা  আক্রমণের উদ্দেশ্যে পিরোজপুর এসে শিবির স্থাপন করেন। রাজা গণেশ এতে ভয় পেয়ে নূর কুতুব আলম (রহ.)-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং তাঁকে ক্ষমা করে ইবরাহিম শর্কিকে জৌনপুরে ফিরে যেতে বলার অনুরোধ করেন ।

নূর কুতুব আলম (রহ.) শেখ আলাউল হকের পুত্র এবং লাহোরের শেখ আসাদের পৌত্র। তিনি পান্ডুয়ার পীর-আউলিয়ার মধ্যে শীর্ষ মর্যাদার অধিকারী হন। পিতা-পুত্র দুজনই পান্ডুয়ার বিখ্যাত শাশ হাজারি দরগায় শায়িত আছেন। পিতার মতো তিনি চিশতিয়া মতাদর্শের পীর ছিলেন। তাঁর অনুসারী শিষ্যকুল ও দরবেশরা কয়েক শতক ধরে বাংলায় মুসলিম সমাজজীবনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শেখ আলাউল হক সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ও তাঁর পুত্র সিকান্দর শাহের সমসাময়িক ছিলেন।

বাংলার মুসলিম রাজ্যকে এক ভয়াবহ ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা করার জন্য শেখ নূর কুতুব আলম তাঁর পিতার চেয়েও বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জৌনপুরের সুলতান ইবরাহিম শর্কি বাংলা আক্রমণ করতে প্রস্তুত হন। এতে গণেশ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যান এবং শেখ নূরের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। দরবেশের কাছে প্রার্থনা করেন, যাতে তিনি সুলতান ইবরাহিমকে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। নূর কুতুব আলম এতে সম্মত হননি, বরং পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি রাজা গণেশকে মুসলমান হতে আদেশ দেন। গণেশ তাতে সম্মত হন, কিন্তু বিস্তারিত শুনে তাঁর রানি এতে বাধা দেন। গণেশ তখন তাঁর ১২ বছরের ছেলে যদুকে নিয়ে শেখের কাছে আসেন। যদুকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে জালালুদ্দীন নাম দেওয়া হয় এবং গণেশ তাঁর পক্ষে সিংহাসন ত্যাগ করেন।

শেখের মৃত্যুর পর গণেশ অবশ্য যদুকে হিন্দু ধর্মে পুনরায় দীক্ষিত করে নিজে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু শিগগির গণেশের মৃত্যু হলে যদু জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

বিনয় আয়ত্ত করার জন্য নূর কুতুব আলম তাঁর পিতার আমল থেকে সব ধরনের কায়িক শ্রমের অভ্যাস করতেন। দরগায় আগত ফকিরদের কাপড় ধোয়া, লাকড়ি ও পানি বহন, শীতকালে পীরের অজু করার জন্য সর্বদা পানি গরম রাখা, এমনকি খানকাহসংলগ্ন শৌচাগার পরিষ্কার করা প্রভৃতি কাজে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। তিনি তাঁর দুই পুত্র শেখ রাফকাতউদ্দীন এবং শেখ আনোয়ারকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেন। সম্ভবত পিতার জীবদ্দশায় শেখ আনোয়ার রাজা গণেশের হাতে সোনারগাঁয়ে শহীদ হন। শেখ নূর কুতুব আলমের অন্য আর একজন প্রধান মুরিদ ছিলেন শেখ হুসামুদ্দীন মানিকপুরী।

শেখ নূর কুতুব আলমের দরগাহসংলগ্ন সরাইখানা ও মাদরাসার ব্যয় নির্বাহের জন্য সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ অনেক গ্রাম দান করেন। দরবেশের মাজার জিয়ারতের জন্য সুলতান বছরে একবার রাজধানী শহর একডালা থেকে পান্ডুয়ায় আসতেন। শেখ নূর কুতুব আলমের মৃত্যুর তারিখ সঠিকভাবে জানা যায় না, তবে সম্ভব তারিখটি হবে ৮১৮ হিজরি বা ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দ এবং এ তারিখের অভিব্যক্তি হলো ‘নূ বানূর-শুদ’ (আলো আলোতে বিলীন)। 

ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে শায়খ নূর কুতুব আলমের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান বাংলার মুসলিম শাসন রাজা গণেশের হাত থেকে রক্ষা করা। (বাংলাপিডিয়া)

গ্রন্থপঞ্জি :  Shaikh Abdul Huq Dehlavi, Akhbar-ul-Akhya fi-Asrar-ul-Abrar; HS Jarrett & Sarkar (tr), Ain-i-Akbari of Abul Fazl, III, Calcutta 1949; A Karim, Social History of the Muslims in Bengal, Chittagong,1998.

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা