kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

আনন্দ-বিনোদন জীবনের অংশ

ড. সালমান আল আওদাহ   

২৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আনন্দ-বিনোদন জীবনের অংশ

আনন্দ-বেদনা নিয়েই জীবন। মানুষের জীবন যেমন কখনো আনন্দের রোল পড়ে, তেমনি কখনো ভরে ওঠে দুঃখ-ব্যথায়। দেহ ও মনের ক্লান্তি-ক্লেশ দূর করতে পারে একটুখানি বিনোদনের রেশ। জীবন মানে সদা-সর্বদা কঠোর নির্দেশনা পালন নয়; বরং মানবজীবনে বিশ্রাম ও অবকাশের প্রয়োজন আছে। জীবন মানেই হাসি-কান্না ও আনন্দ-বেদনার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। রাসুল (সা.) মুসলিমদের আনন্দ-বিনোদনেরও শিক্ষা দিয়েছেন। দ্বিনের সীমা ও পরিধির ভেতরে থেকে জীবনের যে কোনো উপলক্ষে আনন্দ উদযাপন করা যায়। যেমন—জীবনের সাফল্য, পার্থিব উন্নতি-অগ্রগতি ও ইবাদতসহ সব কিছু নিয়েই আনন্দ প্রকাশ করা যায়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার কথা বলুন। এতেই যেন তারা আনন্দিত হয়। তা-ই তাদের জন্য তাদের জমানো সম্পদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১৫)

শরিয়তের প্রমাণিত বিধান লঙ্ঘন করে এমনভাবে আনন্দ-বিনোদনে লিপ্ত হওয়া গর্হিত কাজ। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। খোদাপ্রদত্ত বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে মানুষ অনায়াসেই হালাল-হারামের মাঝে তফাত করতে পারে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, ‘এক লোক রাসুল (সা)-কে ভালো ও মন্দ কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘ভালো কাজ যা অন্তরকে স্বস্তি দেয় ও আত্মাকে প্রশান্ত করে। আর পাপ কাজ হলো যা অন্তরে কালো দাগ ফেলে দেয় এবং অন্তরে দ্বিধা ও সংশয় সৃষ্টি করে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৮০৩০)

জাহির আল-আসলামি (রা.) ছিলেন রাসুল (সা.)-এর পুরনো সঙ্গী। একদিন রাসুল (সা.) তাঁকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেন। সবার উদ্দেশে বললেন, ‘এই দাস কে কিনবে? এই দাস কে কিনবে?’ তিনি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন রাসুল (সা.)। তারপর আস্তে আস্তে নিজের পিঠ রাসুল (সা.)-এর পেটের সঙ্গে লাগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমাকে বেচে বেশি মূল্য পাবেন না।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘কিন্তু আল্লাহর কাছে তোমার মূল্য আছে।’ (মুসনাদে আহমদ,   হাদিস : ১২৬৬৯)

মানবজীবনে সুস্থ বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা চিত্তবিনোদন প্রাণে সঞ্জীবনী শক্তি আনে। এমনকি অতি ব্যস্ত ও দৃঢ়চেতা মানুষের মনেও প্রশান্তি আনে। ওমর (রা.) নিজের মনকে শান্ত করতে কবিতা আবৃত্তি করতেন। কৌতুক ও রসিকতা করতেন। খোদ রাসুল (সা.) এ শিক্ষা দিয়েছেন। অথচ ওমর (রা)-এর কথা এলেই মনে পড়ে কঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী এক মানুষের ছবি, যে হাসে না, আনন্দ উদযাপন করে না। ওমর (রা) একদিন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সঙ্গে বাজি ধরলেন—কে পানির ভেতর দীর্ঘক্ষণ থাকতে পারে! ইবনে আব্বাস তখন বাচ্চা ছেলে মাত্র। বড়জোর তেরো-চৌদ্দ বছর বয়স। বয়ঃসন্ধির সময়। দুজনের মধ্যে বয়সের আকাশ-পাতাল তফাত। তার সঙ্গে ওমর পানিতে ডুব দিয়েছে কে দীর্ঘক্ষণ থাকতে পারে পরখ করে দেখার জন্য। (আল মুহাল্লা : ১৭৪/৭)

উসমান (রা)-কে প্রশ্ন করা হলো, ‘আচ্ছা হজের সময় মাহরাম কি বাগানে তথা পার্কে প্রবেশ করতে পারবে? তখন তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, সঙ্গে ‘রাইহান’-এর ঘ্রাণও নিতে পারবে।’ (উমদাতুল কারি, ১৫৬/৯)

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলতেন, ‘পার্কে গিয়ে গুরুগম্ভীর হয়ে থাকা কিছুতেই ব্যক্তিত্ববোধের পরিচায়ক নয়।’ তিনি কখনো পার্কে গেলে পাগড়ি খুলে বসতেন। আশপাশের সবার সঙ্গে হাস্য-রসিকতা করতেন। ছোট-বড়, শিশু-কিশোর এবং যুবক সবার সঙ্গেই কথা বলতেন। জীবনের চাপ কমাতেন, আনন্দ করতেন। (মানাকিবুশ শাফেয়ি, ২১২/২)

একদিন কিছু কৃষ্ণাঙ্গ যুবক মসজিদে বর্শা নিয়ে খেলছিল। তা দেখে রাসুল (সা.) তাদের বললেন, ‘খেলো।’ অন্য বর্ণনায় আছে, ‘বনু আরফিদার বাসিন্দারা, তোমরা তা গ্রহণ করো। যেন ইহুদি, খ্রিস্টানরা জানতে পারে যে আমাদের ধর্মেও বিনোদন আছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৫০)

ইসলামে অবকাশযাপনের অনুমোদন আছে। অবকাশযাপনে আনন্দ বিনোদন উপভোগ করা সবার উচিত। একনাগাড়ে কঠোর পরিশ্রম করে গেলে কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তা ছাড়া মানুষ লাগাতার কাজ করে যেতে পারে না। অবকাশযাপনের এই সুযোগকে সঠিক কাজে বিনিয়োগ করা উচিত। ইসলামী বিধানের আলোকে চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা দরকার।

‘মাআল মুস্তফা’ বই থেকে

মন্তব্য