kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ইসলামে কারো আনুগত্য করার স্বরূপ

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

২৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইসলামে কারো আনুগত্য করার স্বরূপ

পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সংগঠন সর্বত্র আনুগত্য এক অপরিহার্য বিষয়। এগুলোর কোনো স্তরে আনুগত্য না থাকলে সেটা ভালোভাবে চলবে না, সেখানে নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকবে না। ফলে সেখানে কোনো কাজ সুচারুরূপে পরিচালিতও হবে না। তাই সর্বস্তরে আনুগত্যের কোনো বিকল্প নেই। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো—

কোনো প্রতিবাদ, বিতর্ক ও পরিবর্তন ছাড়া আদেশ-নিষেধ শ্রবণ করা বা মান্য করাই হচ্ছে আনুগত্য।

ফরজ বা ওয়াজিব আনুগত্য

মহান আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আমিরের আনুগত্য করা ওয়াজিব। আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রাসুলের ও তোমাদের নেতৃবৃন্দের।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)

১. আল্লাহর আনুগত্য : আল্লাহর আনুগত্য করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ব্যক্তির ওপর ফরজ। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)

আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে কোনো কিছু বাধা হয়ে দাঁড়ালে সেটা পরিহার করে আল্লাহর আনুগত্যের ওপর অটল থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি মাতা-পিতা তোমাকে চাপ দেয় আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করার জন্য, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মানবে না। তবে পার্থিব জীবনে তাদের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে বসবাস করবে। আর যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে, তুমি তার রাস্তা অবলম্বন করো। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করব।’ (সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৫)

২. রাসুলের আনুগত্য : রাসুলের আনুগত্য করাও ফরজ। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং (আল্লাহর নির্দেশ) শোনার পর তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২০)

আর রাসুলের আনুগত্য করা হলে আল্লাহর আনুগত্য করা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮০)

৩. আমিরের আনুগত্য : আমিরের আনুগত্য করা ওয়াজিব। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্যতা করল সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল। আর যে ব্যক্তি আমিরের আনুগত্য করল সে আমারই আনুগত্য করল, আর যে ব্যক্তি আমিরের অবাধ্যতা করল সে আমারই অবাধ্যতা করল।’ (বুখারি, হাদিস : ২৯৫৭, ৭১৩৭; মুসলিম, হাদিস : ১৮৩৫)

আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যের প্রভাব

১. সফলতা অর্জন : আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য করলে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জিত হবে। আল্লাহ বলেন, ‘অথচ মুমিনদের কথা তো শুধু এটাই হতে পারে যে যখন তাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে ডাকা হয় তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেওয়ার জন্য, তখন তারা বলবে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। আর এরাই হলো সফলকাম।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৫১)

২. আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত লাভ : আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করলে হিদায়াত লাভ হয়। আল্লাহ বলেন, ‘বলো, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো ও রাসুলের আনুগত্য করো। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে তার দায়িত্বের জন্য তিনি দায়ী এবং তোমাদের দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী। আর যদি তোমরা তাঁর আনুগত্য করো, তাহলে তোমরা সুপথপ্রাপ্ত হবে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৫৪)

৩. জান্নাতে প্রবেশ করা : আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করলে জান্নাত লাভ হয়, যা মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই মুমিন সদা সচেষ্ট থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর এটাই হলো মহা সফলতা।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩)

৪. নবী-রাসুল ও শহীদদের সান্নিধ্য লাভ : যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করে তারা পরকালে নবী-রাসুল, শহীদ, সিদ্দিক ও সৎকর্মশীলদের সঙ্গে থাকবে। আল্লাহ বলেন, ‘বস্তুত যে কেউ আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করে, তারা নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সাথি হবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। আর এঁরাই হলো সর্বোত্তম সাথি।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৬৯)

আনুগত্যের স্বরূপ

আল্লাহ সব সৃষ্টির ওপর মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এ কারণে যে মানুষ আনুগত্যশীল। আদম (আ.) আল্লাহর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে ফেরেশতা ও জিন জাতির ওপর মর্যাদাবান হয়েছিলেন। কিন্তু ইবলিস তার প্রভুর হুকুম না মেনে আনুগত্যহীন হয়ে অভিশপ্ত হয়েছিল। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘অতঃপর ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা করো। তারা সবাই সিজদা করল ইবলিস ছাড়া। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আল্লাহ বললেন, আমি যখন তোমাকে নির্দেশ দিলাম, তখন কোন বস্তু তোমাকে বাধা দিল যে তুমি সিজদা করলে না? সে বলল, আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। আল্লাহ বলেন, এ স্থান থেকে তুমি নেমে যাও। এখানে তুমি অহংকার করবে, তা হবে না। অতএব তুমি বের হয়ে যাও। তুমি লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১১-১৩)

উক্ত বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হলো—১. ইবলিস স্বীয় প্রভুর হুকুম অমান্যকারী ২. সে অকৃতজ্ঞ ও অবাধ্য ৩. সে অহংকারী ৪. সে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশকারী ৫. সে অন্যকে তুচ্ছজ্ঞানকারী ৬. সে কলহপ্রিয় ও নেতার সঙ্গে বিতর্ককারী এবং ৭. সে মিথ্যা কথা বলে মানুষকে ধোঁকা দানকারী।

কাজেই এসব কাজ আনুগত্য মেনে নেওয়ার অন্তরায়।

সর্বোপরি, মানুষের আনুগত্যের ক্ষেত্রে এ কথা মনে রাখতে হবে যে ‘স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির কোনো আনুগত্য নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ৭২৫৭)। মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন।

 

মন্তব্য