kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

রাজ্য বিস্তার ও ইসলামীবিজয়ের পার্থক্য

সাইয়েদ ওয়াজেহ রশিদ নদভি   

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাজ্য বিস্তার ও ইসলামীবিজয়ের পার্থক্য

ইসলামী শিক্ষার কারণে মানুষের চিন্তা-ভাবনায় যে মৌলিক পরিবর্তন আসে তা হলো স্বাধীনতার চিন্তা। স্বাধীনতার এ ধারণা পশ্চিমাদের তৈরি ‘স্বাধীনতা পূর্ব ধারণা’র অনুরূপ নয়, যা সমগ্র জীবনের পরিবর্তে কেবল ধর্মীয় ও চারিত্রিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ। ইসলামে স্বাধীনতার ধারণা এক আল্লাহর নিঃশর্ত দাসত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মূলত এক আল্লাহর দাসত্বের মাধ্যমে মুমিন পৃথিবীর অন্য সব দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এমনকি সে জীবন, সম্মান-খ্যাতি, ধন-সম্পদের মোহ থেকে স্বাধীন হয়ে যায় এবং নিজের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তিকে আল্লাহর ইচ্ছাধীন করে দেয়। মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ‘জীবন’ মুমিনের দৃষ্টিতে আল্লাহ প্রদত্ত আমানত। এ জন্য আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী জীবনযাপন করা এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য জীবন উৎসর্গ করা তার কাছে সম্মান ও সৌভাগ্যের বিষয়।

ইসলাম কল্যাণের পথে জীবন দান করার উত্তম প্রতিদান ও পুরস্কার ঘোষণা করেছে। যে ব্যক্তি নিজেকে রক্ষা করতে, নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে এবং নিজের দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে জীবন দেয় ইসলাম তাকেও শহীদের মর্যাদা দিয়েছে। সাঈদ বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষার্থে যুদ্ধ করে মারা যায় সে শহীদ; যে ব্যক্তি তার পরিবারের লোকদের রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় সে শহীদ; যে ব্যক্তি তার দ্বিন রক্ষা করার জন্য নিহত হয় সে শহীদ; যে নিজ প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪০৯৫)

ইসলামী বিজয় ও সাম্রাজ্যবাদ (জোরপূর্বক আধিপত্য বিস্তার) দুটি পরস্পরবিরোধী জিনিস। ইসলামের বিজয়যাত্রা মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের সামনে রিবয়ি ইবনে আমের (রা.) যেমনটি বলেছিলেন—‘আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন যেন আমরা তাঁর বান্দাদের মানুষের দাসত্বের থেকে মুক্ত করে কেবল তাঁর দাসত্বের দিকে এবং পৃথিবীর সংকীর্ণতা থেকে ইসলামের ন্যায়বিচারের দিকে নিয়ে যাই।’

মানবজাতির জন্য দাসত্ব থেকে মুক্তি ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা সর্বপ্রথম ইসলামই দিয়েছে। বিপরীতে ধর্মীয় ও সামরিক সাম্রাজ্যবাদ মানুষকে পরাজিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিতই করে। ইসলাম তার বিজয়াভিযানে ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব, মানুষের সম্মান ও মর্যাদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও অবিচারের পরিবর্তে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। অন্যায়ভাবে হত্যা কোরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে জঘন্যতম গুনাহ; বরং একজন মানুষ হত্যা করাকে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার তুল্য বলা হয়েছে। মানবহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর বিধান ও শাস্তি রয়েছে শরিয়তে।

ভারতবর্ষে মুসলিমরা সংখ্যায় কম হওয়ার পরও দীর্ঘকাল শাসন করেছে এবং তারা খুব বড় কোনো বিদ্রোহেরও মুখোমুখি হয়নি। কারণ মুসলিমরা ভারতীয়দের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও চারিত্রিক বিচারে উন্নত জীবনের দিশা দিয়েছে। পরস্পর বিরোধে লিপ্ত ভারতবর্ষকে অখণ্ডতা দান করেছে। ভারতীয় সমাজের কুসংস্কার ও ধর্মের নামে প্রচলিত দাসত্ব থেকে ভারতবাসীকে মুক্তি দিয়েছে ইসলাম। আল্লামা ইকবাল যেমনটি বলেছেন, ‘এক কাতারে দাঁড়িয়েছে মাহমুদ ও আয়াজ/না কেউ দাস রয়েছে, না আছে কেউ মুনিব।’

ইসলামী শিক্ষা ও দীক্ষা মানুষকে এমন ভারসাম্যপূর্ণ ও বিপ্লবী জীবনদর্শন উপহার দেয়, যা তাকে স্বাধীন ও মুক্ত জীবনে অনুপ্রাণিত করে। জীবনযাপন ও জীবন দানে মুসলিম জাতি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা পৃথিবীতে অনন্য; বরং বলা যায়, উত্তম জীবনযাপন, উত্তম মৃত্যু মুসলিম জাতির বৈশিষ্ট্য। তারা একদিকে যেমন বিশ্ববিজেতা, অন্যদিকে তেমন মানবজাতির শিক্ষক, সভ্যতা-সংস্কৃতির নির্মাতা। তারাই মুক্তচিন্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তা-গবেষণার অবাধ সুযোগ ও মানবীয় মূল্যবোধের নিশ্চয়তা দানকারী। ইসলাম মানুষের দাসত্ব ও তাদের প্রতি দাসসুলভ আচরণকে অভিশাপ মনে করে। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মিসরের শাসক আমর ইবনুল আস (রা.)-এর ছেলের আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, ‘তোমরা কবে মানুষকে দাসে পরিণত করলে, অথচ তার মা তাকে স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছিল।’

চিন্তার স্বাধীনতা, কর্মে উদ্দীপনা ও দেশসেবার অনুপ্রেরণা মুসলিম সমাজের বৈশিষ্ট্য। এ জন্য দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে মুসলিমরা আত্মত্যাগে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। ইসলামী বিজয়ে মানুষ স্বাধীন চিন্তা ও মুক্ত জীবনের নিশ্চয়তা পায়। বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদ মানুষকে দাসত্বের শিকলে বাঁধতে চায়। তারা মানুষের চিন্তা-ভাবনার স্বাধীনতা, শিক্ষা-সংস্কৃতির স্বাধীনতা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ধর্মপালন ও মূল্যবোধের স্বাধীনতা হরণ করে। সর্বগ্রাসী দাসত্বে দেশ ও জাতির সমূহ সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যায় এবং স্থায়ী সাম্রাজ্যবাদী শাসন।

তামিরে হায়াত থেকে মুফতি আবদুল্লাহ নুরের সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর

মন্তব্য