kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

হাদিস অন্বেষণে ৫ হাজার কিমি পদযাত্রা

মুফতি ইবরাহিম সুলতান   

২৩ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাদিস অন্বেষণে ৫ হাজার কিমি পদযাত্রা

হাদিসের জ্ঞান অর্জনের জন্য যাঁরা দূরদেশ ভ্রমণ করেছেন, তাঁদের একজন বাকি ইবনে মাখলাদ (রহ.)। তাঁর পুরো নাম আবু আব্দুর রহমান বাকি ইবনে মাখলাদ উন্দুলুসি। ২০১ হিজরিতে তিনি স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য মিসর, সিরিয়া, হিজাজ, বাগদাদসহ অন্যান্য দেশে তিনি একাধিক সফর করেন। তাঁর প্রথম সফর ছিল ১৩ বছর এবং দ্বিতীয় সফর ছিল ২০ বছরব্যাপী। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্পেন থেকে প্রতিটি সফর তিনি হেঁটে করেছেন।

পদব্রজে দীর্ঘ সফরের একটি স্মৃতি ইতিহাসে আজও তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। মাত্র ২০ বছর বয়সে সে সময়ের বিখ্যাত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর কাছে হাদিস অন্বেষণে তিনি পদব্রজে স্পেন থেকে বাগদাদ সফর করেন। ঘটনাক্রমে সে সময় আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে গৃহবন্দি ছিলেন। তবু তাঁর কাছ থেকে হাদিস শ্রবণে তিনি প্রচণ্ড উদগ্রীব ছিলেন। অত্যন্ত কষ্টকর সেই সফরের কথা তিনি এভাবে তুলে ধরেন : “স্পেন থেকে দীর্ঘ সফর শেষে আমি যখন বাগদাদের কাছাকাছি পৌঁছলাম, তখন শুনতে পেলাম রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ইমাম আহমদ (রহ.) গৃহবন্দি হয়ে আছেন। ছাত্র, শুভাকাঙ্ক্ষী, মুসাফির বা অন্যান্য সাধারণ মানুষের যাতায়াত তাঁর কাছে ছিল নিষিদ্ধ। এমনকি তাঁর কাছ থেকে কেউ হাদিস শুনতে পারবে না—এ মর্মে রাষ্ট্রীয় নির্দেশনাও জারি করা হয়েছিল কঠোরভাবে, যা শুনে সত্যি আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে দেখা করার বিভিন্ন কৌশল বের করার লক্ষ্যে একটি আবাসিক হোটেলে আসবাবপত্র রেখে বাগদাদের ‘জামে কাবির’ মসজিদে চলে আসি। এখানে এসে দেখি হাদিসের কয়েকটি দরস চলছে। আমি দেখেশুনে একটিতে বসে পড়লাম। আমি যে মজলিসে বসা ছিলাম, সেই মজলিসের দরস প্রদান করছিলেন হাদিস গবেষক শায়খ ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মঈন (রহ.)। দেখলাম তিনি হাদিস বর্ণনাকারীদের নিয়ে পর্যালোচনা করছেন। কাউকে জয়িফ বা দুর্বল বলছেন। আবার কাউকে শক্তিশালী বা আস্থাভাজন বলছেন। সুযোগ বুঝে আমিও তাঁকে কয়েকজন হাদিস বর্ণনাকারী এবং হাদিসের মান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি এর যথাযথ জবাব দিলেন। সর্বশেষ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বস্ফািরিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, আমার মতো সামান্য ব্যক্তি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের ব্যক্তিত্ব পর্যালোচনা করব! তিনি হলেন মুসলমানদের ইমাম ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। এ কথা শুনে তাঁর প্রতি আমার মন আরো আকৃষ্ট হলো এবং তাঁর কাছ থেকে  হাদিস শোনার আগ্রহ প্রচণ্ডভাবে বৃদ্ধি পেল। দেরি না করে আমি আহমদ (রহ.)-এর বাড়ি খুঁজতে বের হলাম। এক ব্যক্তির মারফতে তাঁর ঠিকানা জেনে ছদ্মবেশে তাঁর দরজায় কড়া নাড়লাম। তিনি দরজা খুলতেই বললাম আমি একজন মুসাফির। এ দেশে আমি প্রথমবারের মতো এসেছি। আমি একজন হাদিস অন্বেষণকারী ও হাদিস সংকলক। শুধু আপনার উদ্দেশে আমি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছি। তিনি আমাকে বললেন ওই পথ দিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করো। কোনো গুপ্তচর যেন তোমাকে দেখে না ফেলে। এরপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তোমার ঠিকানা কী? কোত্থেকে এসেছ? বললাম, দূরবর্তী পশ্চিমা দেশ থেকে। জিজ্ঞেস করলেন আফ্রিকা থেকে? আমি বললাম, না। এর চেয়েও দূরবর্তী দেশ, স্পেন থেকে। এ কথা শুনে তিনি আমাকে বললেন, নিশ্চয়ই তোমার বাসস্থান অনেক দূরে। তোমার মতো হাদিস অন্বেষণী ব্যক্তির সঙ্গে উত্তম প্রতিদান দেওয়ার চেয়ে আমার কাছে আর কোনো প্রিয় বস্তু নেই। তবে আমি এই মুহূর্তে কঠিন পরীক্ষায় নিপতিত। হয়তো তুমি সে কথা জানো। আমি বললাম, সে কথা জেনেশুনেই বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে আমি আপনার কাছে এসেছি। এরপর নিয়মিত ছদ্মবেশে আমি তাঁর কাছে হাদিস শুনে হোটেলে চলে আসতাম। একপর্যায়ে তিনি গৃহবন্দি থেকে মুক্তি পেয়ে আগের মতো নিয়মতান্ত্রিক মসজিদে বড় পরিসরে দরস দিতেন। আমিও নিয়মিত দরসে বসে হাদিস শুনতাম, লিখতাম। তিনি আমাকে বেশ যত্ন করতেন।” (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৩/২৯১-২৯২)

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা