kalerkantho

রবিবার। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৬ ডিসেম্বর ২০২০। ২০ রবিউস সানি ১৪৪২

মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে মুসলিম সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি

সাইয়েদ মুহাম্মদ রাবে হাসানি নদভি   

২২ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে মুসলিম সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি

মুসলিমরা ইসলামী শরিয়তের ব্যাপারে উদার দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে। কেননা তা কিয়ামত পর্যন্ত সব মানুষের জন্য এবং পৃথিবীর সব অঞ্চলের জন্য প্রবর্তিত। শরিয়তের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যই অকাট্যভাবে প্রমাণ করে এটি সর্বজনীন ও আল্লাহ প্রদত্ত জীবনবিধান। তা যেমন সহজ ও সাবলীল, তেমনি মানব প্রকৃতির অনুকূল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদ-দিনু ইউসরুন’ ইসলাম সহজ ও সাবলীল। তিনি এটাও বলেছেন, কেউ দ্বিনকে কঠোররূপে প্রতিপালন করতে চাইলে সে নিজেই ব্যর্থ ও পরাজিত হবে। সুতরাং দ্বিন ও শরিয়তের ব্যাপারে মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি হবে সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ। দ্বিন যদি কঠোররূপে প্রতিপালন করা হয়, তবে তা বিশ্বজনীন ও কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানুষের জন্য প্রবর্তিত—এ দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শরিয়তের যেসব বিধান প্রবর্তন করেছেন তাতে মানুষের প্রয়োজন ও প্রকৃতির কথা জোরালোভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি নিজেও একই ‘আমল’ (ধর্মীয় বিধান পালন) ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে পালন করেছেন, সাহাবিদের কর্মপদ্ধতির ভিন্নতার স্বীকৃতি দিয়েছেন, কিছু বিষয়ে পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার বিবেচনায় ‘অবকাশ’ গ্রহণের সুযোগ রেখেছেন, যেন প্রয়োজনের সময় মানুষ তা থেকে উপকৃত হতে পারে।

সাহাবিরা মহানবী (সা.)-কে একটি কাজ ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে করতে দেখেছেন বা সাহাবিদের বিভিন্ন পদ্ধতিতে করার নির্দেশ দিতে দেখেছেন। ফলে যে সাহাবি যে পদ্ধতিতে করতে বা নির্দেশ দিতে দেখেছেন তিনি সেভাবেই তা বর্ণনা করেছেন। এসব বিধান ও পদ্ধতিগুলোর মধ্যে বাহ্যত কিছু ভিন্নতাও রয়েছে, ফলে পরবর্তী আলেমদের ব্যাখ্যায়ও মতভিন্নতা তৈরি হয়েছে। এভাবেই ফিকহশাস্ত্রে (ইসলামী আইন) একাধিক শাখার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সব শাখার মূলভিত্তি এক ও অভিন্ন। সব ফিকহি মাজহাবের উৎস মহানবী (সা.)-এর কথা ও কাজ। তবে মনে রাখতে হবে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা ও কাজের এ ভিন্নতা ভুল ও ত্রুটির কারণে নয়; বরং তা আল্লাহর প্রজ্ঞাময় ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আল্লাহর নবী—যিনি আল্লাহর বাণী ও শরিয়ত প্রচারের জন্য মনোনীত তার পক্ষে ভুল করা অসম্ভব। আর যে শরিয়ত বা জীবনবিধান কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানুষের জন্য নির্বাচিত তাতেও ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে যাওয়া সম্ভব নয়। বরং ইসলামী শরিয়তের ব্যাপারে ফিকহি মতবিরোধ আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া বিশেষ। যেমন—পবিত্রতা অর্জনে পানির ব্যবহার নিয়ে ফিকহি মাজহাবে মতভিন্নতা রয়েছে। কোনো কোনো মাজহাবের অবস্থান কঠোর আবার কোনো কোনো মাজহাবের অবস্থান নমনীয়। যদি এ ক্ষেত্রে একটি মতই চূড়ান্ত হতো, তবে পানির তীব্র সংকট রয়েছে এমন অঞ্চলের মানুষ কষ্টে পড়ে যেত।

শরিয়তের বিধানাবলির ক্ষেত্রে যে ভিন্নতা; বরং যে প্রশস্ততা বিভিন্ন বর্ণনা ও সাহাবিদের আমলের ভিন্নতা থেকে পাওয়া যায়, তা বাহ্যত বিরোধপূর্ণ মনে হলেও এর মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজনই পূরণ করা হয়েছে। বিধানের ভিন্নতার কারণেই সব অঞ্চল ও পরিবেশের অনুকূল বিধানাবলি শরিয়তে বিদ্যমান। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিশ্বাস হলো, ফিকহি বিধানে ইমামদের মতামতগুলো পরস্পর ভিন্ন হলেও তা কোরআন-সুন্নাহসহ শরিয়তের গ্রহণযোগ্য উৎস থেকে গৃহীত হওয়ায় তা আপন স্থানে সঠিক এবং তা অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবকাশ ও অনুগ্রহ।

যখন কোনো মত ও মতবাদ পূর্ণ দ্বিয়ানত ও আমানতের (ধার্মিকতা ও বিশ্বস্ততা) সঙ্গে গ্রহণ করা হয় এবং তা গ্রহণকারী জ্ঞান ও গবেষণা, আল্লাহভীতি ও নিষ্ঠা-নিবেদনের বিচারে গ্রহণযোগ্য হয়, তার কাজ কিভাবে ভ্রষ্টতা বিবেচিত হতে পারে? খুব বেশি হলে তা ইজতিহাদি (গবেষণাগত) ভুল হতে পারে। আর কারো গবেষণায় ভুল হলেও আল্লাহর কাছে তার জন্য প্রতিদান রয়েছে। সুতরাং এ বৈচিত্র্য বিরোধের কারণ হতে পারে না। এমন মতভিন্নতা সামনে রেখে নিজেকে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং অন্যকে পথভ্রষ্ট বলা উচিত নয়। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বনি ইসরাঈলের এমন বিভেদ ও বিরোধের কঠোর সমালোচনা করেছেন, এসবের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রতি উৎসাহিত করেছেন।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কখনো কখনো সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত মতবাদের অনুসারীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে চলে যায় এবং মতবিরোধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে—যেমনটি ঈমান-ইসলাম ও কুফরির প্রশ্নে হওয়ার কথা ছিল। প্রত্যেক মাজহাব ও মতবাদের অনুসারী নিজেকে প্রকৃত মুসলিম এবং অন্যদের পথভ্রষ্ট মনে করে। এমনকি তারা পরস্পরের পেছনে নামাজও পড়ে না। অথচ পবিত্র কোরআনের নির্দেশ হলো—‘এই যে তোমাদের জাতি, এটা একই জাতি এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং আমার ইবাদত করো।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৯২)

নবী-রাসুলদের শরিয়ত (বিধানাবলি) ভিন্ন হওয়ার পরও কোরআনের নির্দেশ হলো, ‘আমরা তার রাসুলদের মধ্যে তারতম্য করি না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৫)

অন্যদিকে একই শরিয়তের অনুসারী হয়েও পরস্পরের প্রতি সহনশীল হতে পারছে না অনেকে। কোরআন ও হাদিসে মুসলিমদের ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্বে’র তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ভ্রাতৃত্বের একটি সৌন্দর্য হলো মতবিরোধ হওয়ার পরও তারা ভাই থাকে। সুতরাং ঈমান ও সততার সঙ্গে কোরআন-হাদিস থেকে বিধান উদ্ভাবনকারীদের সত্যের অনুসারী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাদের প্রতি সম্মান ও শিষ্টাচার দেখাতে হবে। যদিও তাঁর গবেষণা ও বিবেচনায় কোনো ভুল থেকে যায়। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) বলতেন, ‘আমি খুশি হতাম না যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের মধ্যে কোনো মতভিন্নতা না থাকত। কেননা সাহাবিরা যদি কোনো বিষয়ে একমত হয়ে যেতেন এবং পরবর্তী সময়ে কেউ সাহাবিদের মতামতের বিপরীত কিছু করত, তবে সে পথভ্রষ্ট প্রমাণিত হতো। কিন্তু সাহাবিদের ভেতর মতভিন্নতা থাকায় পরবর্তী সময়ে একজন একটি মত গ্রহণ করার এবং অপরজন অন্য মত গ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছে। এটা অনেক বড় অবকাশ।’

চিন্তা ও কাজের দূরত্ব থাকার পরও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পোষণের দৃষ্টান্তও পূর্ববর্তী আলেমদের ভেতর পাওয়া যায়। ইমাম শাফেয়ি (রহ.), ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ও অন্যান্য মাজহাবের শীর্ষ আলেমরা পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান লালন করতেন। যদি সেসব পুণ্যাত্মা ইমামদের পথ পরিহার করে ইসলামকে নিজের মত ও মতবাদের ওপর দাঁড় করানো চেষ্টা করা হয়, তবে তা ইসলামের আয়তন, পরিধি ও সর্বজনীনতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে। আল্লাহ সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

তামিরে হায়াত থেকে আতাউর রহমান খসরুর ভাষান্তর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা