kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

ফ্রান্সে মুসলিম শাসনের স্মৃতিচিহ্ন

আতাউর রহমান খসরু   

১ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফ্রান্সে মুসলিম শাসনের স্মৃতিচিহ্ন

স্পেনে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রতিবেশী ফ্রান্সের দিকে মনোযোগ দেন মুসলিম সেনাপতিরা। মুসলিম স্পেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মুসলিম স্পেন (আধুনিক স্পেন-পর্তুগাল) তৎকালীন ‘গল রাষ্ট্রে’র (আধুনিক ফ্রান্স)-এর সীমান্তবর্তী আলবার্ত পর্বতমালার পাদদেশে পৌঁছে গিয়েছিল মুসলিম বাহিনী। পরবর্তী সময়ে ফ্রান্সের কিছু শহরও মুসলমানের শাসনাধীন হয়। তবে ফ্রান্সে ইসলামী শাসন কখনোই স্থিতিশীল ছিল না।

 

ফ্রান্সে মুসলমানের আগমন

ফ্রান্সের মাটিতে ইসলামের আগমন হয়েছিল রাজনৈতিকভাবেই। ১০১ হিজরিতে কর্ডোভা শাসক সামাহ বিন মালিক আল-খাওলানি ফ্রান্সের সেপ্টিম্যানিয়া শহর জয় করার আগে সেখানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। সেপ্টিম্যানিয়া জয় করার পর সামাহ ম্যাজিলিন, কারাখিশোনা ও আরবোনা শহর জয় করে তুলুজের দিকে অগ্রসর হন।

 

ফরাসি ভূমিতে মুসলিম শাসনের উত্থান-পতন

স্পেন সীমান্তবর্তী ফ্রান্সের যেসব শহর ও ভূমিতে মুসলিম  শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা মুসলমানের শাসনাধীন ছিল খুব সামান্য সময় এবং পুরো শাসনকালটাই ছিল যুদ্ধবিক্ষুব্ধ ও অস্থিতিশীল। এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ এমন—সেপ্টিম্যানিয়া জয় করার পর সামাহ বিন মালিক তুলুজ শহর অবরোধ করেন এবং তা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যান। কিন্তু একুইটেনিয়ানের শাসক ডিউক উডো হঠাৎ মুসলিম বাহিনীর ওপর চড়াও হন এবং সামাহ শহীদ হন। তাঁর পর আমবাসা ইবনে সাহিম আল-কালবি ক্ষমতাসীন হন এবং সেপ্টিম্যানিয়াসহ আশপাশের সাতটি বৃহৎ শহর পুনরুদ্ধার করেন। অতঃপর প্রোভিন্স অঞ্চল জয় করে লিয়ন শহরে পৌঁছান এবং ১০৭ হিজরিতে উতুন শহর জয় করেন। কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীরা বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং তাঁর ফেরার পথ বন্ধ করে দিয়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে। তখন আমবাসাও শহীদ হন। তাঁর মৃত্যুর পর স্পেনে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। ফলে মুসলিম বাহিনী ফ্রান্সের দিকে মনোযোগী হওয়ার সুযোগ হারায়।

৭৩০ খ্রিস্টাব্দে আবদুর রহমান গাফেকি শাসক হওয়ার পর স্পেনে রাজনৈতিক স্থিরতা আসে। তিনি তুলুজ শহরে মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলার প্রতিশোধ নিতে ডিউক উডোকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেন। আবদুর রহমান গাফেকি এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে জারুনের দিকে অগ্রসর হন। রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয় এবং ফরাসি ভূমির প্রায় অর্ধেক জয় করে। এমনকি প্যারিসের এক শ মাইল দূরে অবস্থিত সানস শহরও মুসলিম বাহিনীর অধীন হয়। মুসলিম বাহিনীর হাতে ফ্রান্স বিপুল ভূমি হারানোর পর ইউরোপের অন্যান্য শাসকরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং মুসলিম বাহিনীকে প্রতিহত করতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১১৪ হিজরি মোতাবেক ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে বিলাতুশ-শুহাদা নামক স্থানে উভয় বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। সাত দিন উভয় বাহিনীর ভেতর তুমুল যুদ্ধ হওয়ার পর অষ্টম দিনে মুসলিম বাহিনীর পরাজয় হয়। এ যুদ্ধে পরাজয়ের পর মুসলিম বাহিনী ফ্রান্সের মাটিতে আর স্থির হতে পারেনি। এরপর যদিও ছোট ছোট কিছু বিজয় এসেছিল, তবে ক্রমান্বয়ে মুসলিম শাসন গুটিয়ে গিয়েছিল ফ্রান্স থেকে। অবশেষে ১৪২ হিজরি মোতাবেক ৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে সেপ্টিম্যানিয়া শহর মুসলমানদের হাতছাড়া হয়।

 

ফ্রান্সে মুসলিম শাসনের স্মৃতিচিহ্ন

ফ্রান্সে মুসলিম শাসনকাল যুদ্ধবিক্ষুব্ধ ও অস্থিতিশীল হওয়ায় ফরাসি সমাজ ও রাষ্ট্রে মুসলিমরা শাসক হিসেবে বিশেষ কোনো অবদান রাখার অবকাশ পাননি। তবে ফ্রান্সে খণ্ডকালীন মুসলিম শাসনের টুকরা টুকরা স্মৃতিচিহ্ন এবং স্পেনে দীর্ঘ মুসলিম শাসনের প্রভাব এখনো ফরাসি সমাজে দৃশ্যমান। ফরাসি ভাষায় কমপক্ষে পাঁচ শ শব্দ এমন রয়েছে, যা আরবি ভাষা থেকে এসেছে। ফরাসি কবিতায়ও আরবি ছন্দরীতির প্রভাব রয়েছে। আমির সাকিব আরসালান তাঁর ‘তারিখু গাজওয়াতিল আরব’ গ্রন্থে ফ্রান্সের এমন অসংখ্য সড়ক, পাড়া, গ্রাম ও শহরের নাম উল্লেখ করেছেন, যা আরবি ভাষা থেকে গৃহীত। এমনকি তিনি কিছু ফরাসি পোশাক ও খাবারের নাম উল্লেখ করেছেন, যা ফ্রান্সে মুসলিম শাসনের স্মৃতি বহন করে। (বিস্তারিত : পৃষ্ঠা ২৬৪-২৭২)

বিশেষত মুসলিমরা ফ্রান্সের কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিল। দক্ষিণ ফ্রান্সের স্থাপত্যশৈলীতেও মুর স্থাপত্যরীতির প্রভাব লক্ষ করা যায়। এ ছাড়া মুসলিম স্পেনের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আলো ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ফ্রান্সকেও আলোকিত করেছিল। আবদুল হামিদ সিদ্দিকী এ বিষয়ে লেখেন, ‘বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইউরোপ আরবদের কাছে বিশেষভাবে ঋণী। এ ঋণ শুধু লোক ঝলসানো আবিষ্কার এবং বৈপ্লবিক থিওরীর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এ ঋণ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে। কেননা এ দৃষ্টিভঙ্গি মূলত মুসলিমদেরই গড়া।’ (পাশ্চাত্য সভ্যতার উৎস, পৃষ্ঠা ৮৫)

 

ফরাসি বিপ্লবে মুসলিম অনুপ্রেরণা

সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও স্বাধীনতার স্লোগান নিয়ে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লব, যা আধুনিক ফ্রান্সের ভিত গেড়েছিল তাতেও মুসলিমদের অংশগ্রহণ ছিল। ফলে ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ মুসলিমদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব প্রদান করে। ফরাসি বিপ্লবে মুসলমানের ভূমিকা সম্পর্কে বিশিষ্ট লেখক ফারুক ওয়াসিফ লেখেন, ‘ফরাসি বিপ্লবের নেতা রোবসপিয়ের ইসলামের সাম্যের দ্বারা উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন। ... ফরাসি বিপ্লবে মুসলমানরাও জড়িত ছিল। বিপ্লবীরাও বিপ্লবের আহ্বান আরবিতে প্রকাশ করে। গুজরাটের নওয়াবের পুত্র আহমেদ খান ১৭৯৪ সালে প্যারিসে গিয়ে বিপ্লবে সংহতি জানান এবং ভারতের স্বাধীনতার প্রেরণা পান। ... ফরাসি বিপ্লব ৯০ দিনও টিকতে পারত না যদি উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসক মোহাম্মদ ঘেইস জাহাজ ভর্তি করে গম না পাঠাতেন। সে সময় দক্ষিণ ফ্রান্সে দুর্ভিক্ষ চলছিল। রাজতান্ত্রিক ইউরোপ যখন বিপ্লব ধ্বংসের জন্য লড়ছে, তখন একমাত্র মুসলিম দুনিয়াই ছিল ফ্রান্সের পক্ষে। ১৭৯৫ সালে বিপ্লবী কমিটি ইসলামের ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তধর্মীয় চুক্তি আরবি থেকে ফরাসিতে অনুবাদ করার ঘোষণা দেয়।’ (কলাম : ফরাসি প্রতিবিপ্লব ও মাখোঁর ‘মুসলিম’ সমস্যা)

 

ফ্রান্সের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মুসলমানের অবদান

১৮৩০ সালে আলজেরিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত বিরাট একটি অংশে ফ্রান্সের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক মুসলিম ফ্রান্সে শ্রমিক হিসেবে আসে এবং ফরাসি বাহিনীতে যোগ দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফরাসি বাহিনীতে মুসলমানের অংশগ্রহণ আরো বাড়ে। এ সময় ছয় লাখ মুসলিম সেনা ফ্রান্সের পক্ষে লড়াই করে প্রাণ বিসর্জন দেয়। যার মধ্যে ভার্ডন যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্যারিস থেকে ২৬২ কিলোমিটার দূরে সংঘটিত তিন শ দিনব্যাপী এ যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা সাত লাখ, যার মধ্যে ফরাসিদের সংখ্যা তিন লাখ ৬২ হাজার। এ যুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবীদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছিল মুসলিম। ভার্ডন যুদ্ধে নিহতদের স্মরণে নির্মিত সৌধে মুসলিম সেনাদের স্মরণে পৃথক স্তম্ভও স্থাপন করা হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত মুসলিম সেনাদের সম্মানে ১৯২৬ সালে প্যারিস গ্র্যান্ড মস্ক নির্মাণ করা হয়।

তথ্যঋণ :  স্পেনে মুসলিম ইতিহাস ও কীর্তি, তারিখু গাজওয়াতিল আরব ও (প্রবন্ধ) কালিমাতু ফ্রান্সিয়া মিন আসলিল আরব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা