kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

ধর্মীয় উদারতা

অমুসলিম মা যখন মুসলিম মেয়ের ঘরে

মুফতি সাআদ আহমাদ   

২৯ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মদিনার এক দরিদ্র পরিবার। কোনো মতে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থায় চলে তাঁদের দিন। গৃহিণী আসমা আর স্বামী যুবায়ের। এক ছেলের নাম আব্দুল্লাহ। তিনজনের এই ছোট্ট সংসারে ঘরের সব কাজ আসমা নিজ হাতেই করেন। কিছু গবাদি পশু আছে, এগুলোর দেখাশোনাও তাঁর হাতে।

প্রতিদিনের মতো ঘরের চৌকাঠে পা ঝুলিয়ে খেজুরের বিচি চূর্ণ করতে ব্যস্ত আসমা। হঠাৎ বাড়ির আঙিনায় জনৈকা বৃদ্ধা মহিলা উপস্থিত। উষ্কখুষ্ক চুল। ধুলোমলিন চেহারা। হাতে একটি বোঝা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বহুদূর পাড়ি দিয়ে এসেছেন তিনি।

মহিলাকে চিনতে আসমার বেশি বেগ পেতে হলো না। যাঁর গর্ভে ১০ মাস কেটেছে, সেই মমতাময়ী মাকে চিনতে বেশি সময় লাগার কথা নয়।

নিজের কলিজার টুকরা মেয়েকে দেখে চক্ষু শীতল করতে সুদূর মক্কা থেকে এসেছেন তিনি।

মাকে দেখেই চোখের লোনা জল কখন যে বাঁধ ছাপিয়ে গণ্ডদেশ বেয়ে চলেছে, জানা নেই আসমার। মনের অজান্তেই একপা-দুপা করে মায়ের দিকে এগোতে লাগলেন তিনি।

কিন্তু হঠাৎ তাঁর মাথায় এলো—আচ্ছা, মা তো মুসলমান নয়। তিনি তো মহান আল্লাহকে বিশ্বাস করেন না। নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর রাসুল বলে স্বীকার করেন না। তাহলে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে কিভাবে আপস হবে। ঈমান ও কুফরের মাঝে তো কোনো সম্পর্ক হতে পারে না।

হাতের ইশারায় মাকে থামিয়ে দিলেন আসমা। নিজেও মুখ ফিরিয়ে নিলেন অন্য দিকে। মাকে লক্ষ করে বললেন, একটু অপেক্ষা করুন আম্মিজান!  আমি নবীজি (সা.)-এর কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে আপনার সঙ্গে সাক্ষাত করতে পারব না। আমার ঘরে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে পারব না। কারণ কোনো মুসলমানের সঙ্গে কোনো অমুসলিমের আন্তরিকতা বা হৃদ্যতা সম্ভব নয়। এতে মুসলমানদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

হাতের বোঝাটি তখনো মা কুতাইলার হাতে। ঘরের আঙিনায় তাঁকে অপেক্ষমাণ রেখে আসমা ছুটে গেলেন প্রিয় নবীজি (সা.)-এর কাছে। হে আল্লাহর রাসুল! আমার মা কুতাইলা মক্কা থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারি? তাঁকে আমার বাড়িতে অবস্থানের সুযোগ দিতে পারি?

আসমার কথাগুলো শেষ না হতেই নবীজি (সা.) কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। তাঁকে খুব অদ্ভুত দেখাচ্ছে। যেন তিনি সবার মাঝে থেকেও নেই। হারিয়ে গেছেন ভিন্ন জগতে। ওহি অবতীর্ণ হওয়ার সময় তাঁর এমন অবস্থা হয়ে থাকে। তবে কি আসমার ঘটনা নিয়ে সাত আসমানের ওপরে আলোচনা হচ্ছে! বিষয়টির সমাধানে কি পবিত্র কোরআনের আয়াত অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে!

আসমা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। নবীজি (সা.) কী জবাব দেবেন। কিছুক্ষণ পর নবীজি (সা.)-এর অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বেশ হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছে তাঁকে। কপালে মুক্তাদানার মতো ঘামের ফোঁটাগুলো সে সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। ওহি অবতীর্ণ হওয়ার কালে নবীজি এভাবে ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠেন। নবীজি বলেন, আসমা! তুমি তোমার মায়ের পূর্ণ খাতির-যত্ন করতে পারো। আল্লাহ তাআলা তোমাদের ব্যাপারে কোরআনে আয়াত নাজিল করেছেন—‘যারা ধর্মীয় ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়নি এবং তোমাদের স্বীয় ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কার করেনি তাদের সঙ্গে সদাচরণ করতে এবং ন্যায়সংগত ব্যবহার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেননি...।’ (সুরা : মুমতাহিনাহ, আয়াত : ৮-৯)

আসমা প্রিয় নবীজি (সা.)-এর মুখে আয়াত দুটি শুনলেন। খুশিতে চোখ দুটি ঠিকরে উঠল তাঁর। হৃদয়ে এক প্রশান্তির হিল্লোল তুলে গেল। আনন্দ বোধ করলেন এমন ইসলাম পেয়ে, যার বিশাল ব্যাপকতায় আজ তিনি তাঁর মাকে কাছে পেলেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৯)

লেখক : শিক্ষক, ইমদাদুল উলম রশিদিয়া, ফুলবাড়ি গেট, খুলনা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা