kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

সাম্প্রতিক মুসলিম বিশ্ব

ফ্রান্সে মুসলিমদের উদ্বেগ বাড়ছেই

আবরার আবদুল্লাহ   

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফ্রান্সে মুসলিম শিক্ষার্থীর হাতে একজন শিক্ষক নিহত হওয়ার পর দেশটির সংখ্যালঘু ছয় মিলিয়ন মুসলিম ভয়াবহ নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। দেশটিতে বসবাসরত মুসলিমরা সামাজিক বিদ্বেষ, রাষ্ট্রীয় আইনের কঠোরতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির অবনতির আশঙ্কা করছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেছেন, “কোনো ‘ইসলামিস্ট’ ফ্রান্সে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না।” অন্যদিকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে দুই মুসলিম নারীকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। এ ছাড়া সাময়িকভাবে মসজিদ বন্ধ, মসজিদে পুলিশি অভিযান এবং প্রকাশ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। নিহত শিক্ষক স্যামুয়েল পাতির (৪৭) বিরুদ্ধে অভিযোগ, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি শ্রেণিকক্ষে একাধিকবার মহানবী (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করেন। সন্দেহভাজন হত্যাকারী মুসলিম যুবক চেচেন বংশোদ্ভূত। তাঁকে ঘটনাস্থলে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। নিহত স্যামুয়েল পাতিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘লিজিওন ডি’অনার’ প্রদান করেছেন। প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

হত্যাকাণ্ডের পর ফরাসি সরকার মুসলিম সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে এবং ফ্রান্সের একাধিক মসজিদে প্রতিক্রিয়াশীলরা হামলা চালিয়েছে। সহিংসতার হুমকি পাওয়ার পর বেজিয়ার্স ও বোর্দয়াদের মুসলিম প্রার্থনাস্থলে (অনানুষ্ঠানিক মসজিদ) পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছে। গত ২ অক্টোবর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ‘ইসলামিস্ট সেপারাটিজম’ কর্মসূচি গ্রহণের পর থেকেই ফ্রান্সের মুসলিমরা উদ্বিগ্ন। তখন সারা বিশ্বে ইসলাম ‘সংকটাপন্ন’ মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন ম্যাখোঁ। শিক্ষক হত্যার পর ফরাসি মুসলিমদের সে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের ভয় ইসলামের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের নাম যুক্ত করে ফরাসি সরকার এরই মধ্যে যে নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে স্যামুয়েল ট্র্যাজেডি তাতে নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ফ্রান্সের মুসলিম সমাজকর্মী ইয়াসির লুয়াতি আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমি মনে করি, ফ্রান্সের মুসলিমরা রাজনীতিকদের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। তারা ইসলামভীতিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চায়।’ সোমবার ফরাসি সরকার বলে, তারা সন্দেহভাজন চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করছে একাধিক অভিযান ও দুই শতাধিক মানুষের গণবহিষ্কারের মাধ্যমে।

গণমাধ্যমের তথ্য মতে, ৫০টির বেশি মুসলিম সংগঠনকে লক্ষ্য করা হয়েছে। ‘শেখ ইয়াসিন কালেক্টিভ’কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্যামুয়েল পাতির অবমাননাকর ভিডিও ইউটিউবে প্রচারের অভিযোগে পুলিশ ইমাম আবদুল করিম সেফরিউকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনি যে মসজিদে ইমামতি করতেন তা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। শুধু গত মাসে ফ্রান্সে বন্ধ করে দেওয়া মসজিদ, প্রাইভেট স্কুল, সংস্থা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১২, যার সঙ্গে শিক্ষক নিহত হওয়ার কোনো সংযোগ নেই। আর চলতি বছরে মুসলিমদের ৭২টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে ফ্রান্স।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন ‘দ্য কালেক্টিভ অ্যাগেইনস্ট ইসলাম ফোবিয়া ইন ফ্রান্স’ (সিসিআইএফ) নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। সংস্থাটি দেশটিতে মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষমূলক অপরাধগুলো পর্যবেক্ষণ করে। একটি ফরাসি রেডিও স্টেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সিসিআইএফকে রাষ্ট্রের শত্রু আখ্যা দেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ম্যাঁখোকে কতিপয় সংগঠন নিষিদ্ধ করার অনুরোধ জানান। সিসিআইএফ ডারমানিনের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছে, এতে ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কাজ করা অপরাধ বিবেচিত হয়। গত সপ্তাহে সংগঠনের কর্মী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা মারওয়ান মুহাম্মদ এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘ফ্রান্সে এখন যা হচ্ছে তা নজিরবিহীন। মৌলিক স্বাধীনতা হুমকির মুখে। কেননা সরকার মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর দোষারোপ ও তাদের অপরাধী প্রমাণে মনোনিবেশ করেছে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা শিক্ষক হত্যার পর ফরাসি সরকারের ত্বরিত ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াকে একটি বিশেষ বার্তা হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের আশঙ্কা মুসলিমদের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করতে ফরাসি আইনে বহুমুখী পরিবর্তন আসতে পারে। ২০১৫ সালে প্যারিসে আইসিআইএলের হামলার পর রাষ্ট্রীয় তৎপরতার কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকের যেমন নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে মনে হয়েছিল, এখনো তেমন হওয়ার আশঙ্কা আছে। মানবাধিকারকর্মীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এক শ বছর আগে ইহুদি জাতির বিরুদ্ধে ইউরোপে যে ঘৃণা ও ক্ষোভের আগুন প্রজ্বলিত হয়েছিল ইউরোপের উগ্র জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী রাজনীতি মুসলিমদের সেদিকে নিয়ে যেতে পারে।

তথ্যসূত্র : আলজাজিরা ও ডেইলি সাবাহ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা