kalerkantho

সোমবার । ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৩ নভেম্বর ২০২০। ৭ রবিউস সানি ১৪৪২

আধুনিক সভ্যতায় দাসত্ব

সাইয়েদ ওয়াজেহ রশিদ হাসানি নদভি (রহ.)

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আধুনিক সভ্যতায় দাসত্ব

গবেষক ও চিন্তাশীল মানুষের দাবি, কোনো বিষয়ে নিশ্চিন্ত বিশ্বাসের চেয়ে সে বিষয়ে সন্দেহ ও সংশয় পোষণ করা জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার পক্ষে বেশি উপকারী। কেননা জ্ঞান কোনো জড় বিষয় নয় যে তা সব সময় একই অবস্থায়, একইভাবে স্থির থাকবে, বরং তা মানুষের বোধ ও রুচির মতো পরিবর্তনশীল। মানুষ এগিয়ে যেতে পছন্দ করে। প্রতিনিয়ত তার মধ্যে নতুন বিশ্লেষণ, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা ও উদ্যম তৈরি হয়। একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বিভিন্ন ফলাফল লাভ করে। আর দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতার ভিন্নতার কারণে মতামতও ভিন্ন হয়। এক গবেষক অন্য গবেষকের মতামত গ্রহণ করেন না এবং মতবাদের প্রবক্তা অন্য মতবাদের প্রবক্তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। বলা যায়, বর্তমান বিজ্ঞান ও গবেষণার যুগে সন্দেহ, সংশয় ও প্রত্যাখ্যান একটি ধর্মে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমারা এটিকে অলঙ্ঘনীয় নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করেছে। অথচ পশ্চিমা শিক্ষা ও আদর্শে বড় হওয়া প্রাচ্যের মানুষগুলো পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণে গৌরব বোধ করে।

পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত প্রাচ্যের মানুষগুলোর কাছে পশ্চিমা জ্ঞান ও গবেষণা ঐশ্বরিক জ্ঞানের সমতুল্য। ফলে ঐশ্বরিক ও মানবীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংঘাত হলে তারা ঐশ্বরিক জ্ঞানকে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। তাদের কাছে মানবীয় যুক্তি ও কথিত আধুনিক বিজ্ঞানই প্রজ্ঞা ও সত্যের মাপকাঠি। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিম ও আধুনিক সভ্যতার অনুসারীরা সভ্যতা, সংস্কৃতি, জ্ঞান, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রে পশ্চিমকে পবিত্রতম উৎসর মর্যাদা দেয়। তাদের মনোভাব হলো—পশ্চিমারা কোনো প্রকার ভুলত্রুটি ও স্খলনের ঊর্ধ্বে। চাই সে দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা প্রাচ্যের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ, জীবনপ্রণালী ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যবিরোধী হোক এবং প্রাচ্যের ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার বিপরীত ও জাতিগত বৈশিষ্ট্যের জন্য ক্ষতিকর হোক। তারা পশ্চিমের আনুগত্যে সব ধরনের আত্মত্যাগে প্রস্তুত এবং নিজেদের সব বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্র্য ও জাতিগত অস্তিত্ব থেকে খুশিমনে মুখ ফিরিয়ে নিতে রাজি। প্রাচ্যবাসী, বিশেষত প্রাচ্যের মুসলিমরা যেহেতু পশ্চিমের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদের প্রধান লক্ষ্য, তাই তারা নিজেদের পশ্চিমের সৌভাগ্যবান শিষ্য মনে করে এবং জীবনের সব ক্ষেত্রে পশ্চিমের অনুসরণ করে; বরং পশ্চিমের প্রভাবে প্রাচ্যের মানুষ নিজের সত্তাগত চেতনা, অনুভূতি, দায়িত্ব ও চিন্তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছে। তা হয়েছে পশ্চিমা বিশ্বকে সব ধরনের ভুল ও স্খলনের ঊর্ধ্বে মনে করার কারণে। তাদের দেহ প্রাচ্যীয়, কিন্তু আত্মা ও চিন্তা পশ্চিমা। পশ্চিমা জ্ঞান ও চিন্তার শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার প্রতি আস্থা ও কৃতজ্ঞতাবোধের এই মনোভাব তৈরি হয়েছে ইসলামী শাসনাবসানের পর ঔপনিবেশিক শাসনের ছত্রচ্ছায়ায়। সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অধীনে পরিচালিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো পশ্চিমা ধারার প্রতিটি বিষয়কে সম্মানযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে। পশ্চিমা শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এমন প্রবলভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে ঔপনিবেশিক শাসনাবসানের পরও তা যায়নি।

এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হয়েছে, স্থানীয় লোকজনই দেশ পরিচালনা করছে, নিজস্ব স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, তবু তাদের ভেতর স্বাধীন চিন্তা, আত্মবিশ্বাস, প্রচেষ্টা ও উদ্ভাবনের সম্পদ ও মূলধনের অভাব থেকে গেছে। পশ্চিমা উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়েও প্রাচ্য মানসিক দাসত্বের শিকার। তারা ইউরোপের চোখ দিয়ে দেখে, ইউরোপের মগজ দিয়ে ভাবে এবং ইউরোপের অভিরুচি দিয়ে স্বাদ পরখ করে। নতুন প্রজন্মকে এই ভয়াবহ প্রবণতা থেকে রক্ষা করতে মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও সংস্কারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও শিক্ষকদের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে, জাতীয় জাগরণের চেষ্টা করতে হবে এবং প্রগতি ও উন্নয়নের নতুন রাস্তা তৈরি করতে হবে।

উন্নয়ন প্রশ্নে প্রাচ্যবাসী পেছনের সারিকে বেছে নিয়েছে। প্রতিযোগিতার যুগে তারা সর্বশেষ স্তরে রয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, এমনকি পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা পশ্চিমাদের অনুকরণ ও আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, প্রাচ্যের সাহিত্য ও সমালোচনা সাহিত্যের ওপরও পশ্চিমা প্রভাব প্রবল। যাদের সাহস ও আশাবাদের সর্বোচ্চ মাত্রা পশ্চিমাদের সমকক্ষ ও সহযাত্রী হওয়া, তারা কিভাবে মোকাবেলা করা বা এগিয়ে যাওয়ার চিন্তা করবে? তারা তো স্বাধীন চিন্তা ও গবেষণা, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা, উৎকর্ষ ও উদ্ভাবনের কথা ভাবতেই পারে না। পশ্চিমা ধারায় প্রাচ্যের শিক্ষিত জনরা প্রাচ্যের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবদান ও শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকৃতির যোগ্য মনে করে না। এর চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, পশ্চিমা চিন্তার অনুগামীরা ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে জানতে প্রাচ্যবিদদের দ্বারস্থ হয়। ইসলামের মৌলিক বিষয়েও প্রাচ্যবিদদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে চূড়ান্ত মনে করে। অথচ বেশির ভাগ প্রাচ্যবিদ ইসলামকে সংশয়পূর্ণ করে তোলার চেষ্টাই করেছে।

পশ্চিমাদের অন্ধ অনুসারীদের প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন অনুসন্ধান করে দেখে—ইউরোপ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণা কার কাছ থেকে শিখেছে? পশ্চাৎপদ ও অজ্ঞতায় ডুবে থাকা ইউরোপে জাগরণ সৃষ্টি কারা করেছিল? কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই বলা যায়, পশ্চিমাদের আজকের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা মুসলমানের দান। আর আল্লাহ মেধা ও প্রতিভা নির্দিষ্ট কোনো সময়, সম্প্রদায়, জাতি, বর্ণ, ভূখণ্ডের জন্য নির্ধারিত করেননি, বরং সমগ্র মানবজাতির প্রতি এই অনুগ্রহ মহান স্রষ্টা করেছেন। প্রয়োজন শুধু সুপ্ত এই মেধা, প্রতিভা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগানো। প্রাচ্যবাসীর ভেতর, বিশেষত মুসলিম উম্মাহর ভেতর থেকে পশ্চিমাদের শ্রেষ্ঠত্বের এই ধারণা দূর হওয়া প্রয়োজন। আর তা সম্ভব হবে মুসলিম সমাজের শিক্ষিত জনরা যখন এগিয়ে আসবে এবং সময়ের নেতৃত্ব গ্রহণে প্রস্তুত হবে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিমরা ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধের আলোকে আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও শিক্ষার পুনর্গঠন করবে। তা থেকে অপ্রয়োজনীয় ও অকল্যাণকর বিষয়গুলো বাদ দেবে। মানবীয় মর্যাদা, মূল্যবোধ ও স্বাধীনতা রক্ষা, ইসলামের স্বাতন্ত্র্য, সাম্রাজ্যবাদের মোকাবেলার এটাই সর্বোত্তম পদ্ধতি।

তামিরে হায়াত থেকে আতাউর রহমান খসরুর ভাষান্তর

মন্তব্য