kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

আল-আকসায় স্বর্ণের কালিতে লেখা কোরআনের প্রাচীন অনুলিপি

ওলিউর রহমান   

২২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আল-আকসায় স্বর্ণের কালিতে লেখা কোরআনের প্রাচীন অনুলিপি

ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসার সংগ্রহশালায় সাত শ বছর ধরে সংরক্ষিত আছে স্বর্ণ ও কস্তুরী মিশ্রিত জাফরানের কালিতে লেখা পবিত্র কোরআনের একটি অনুলিপি। ১৩৪৪ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর তৎকালীন সুলতান আলী আবুল হাসান আল মারিনি নিজ হাতে কোরআনের ঐতিহাসিক এ অনুলিপি তৈরি করে আল-আকসায় হাদিয়া পাঠান। মরক্কোর সুলতান আলী আবুল হাসান মানসুর বিল্লাহ আল মারিনি প্রখ্যাত মামলুক সুলতান মুহাম্মদ বিন মানসুর কালাউনের সমসাময়িক। চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে মরক্কোর শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি অভিনব কিছু কাজ করেছিলেন। এর অন্যতম কস্তুরী মিশ্রিত জাফরানের কালিতে নিজ হাতে কোরআনুল কারিমের অনুলিপি তৈরি করে আল-আকসা মসজিদে পাঠান। আল-আকসা ছাড়াও একইভাবে তৈরি করা কোরআনের দুটি অনুলিপি মসজিদুল হারাম ও মসজিদ-ই-নববীতেও উপহার পাঠিয়েছিলেন সুলতান আল মারিনি। তবে সেগুলো সংরক্ষিত থাকেনি।

সাত শ বছর আগের কোরআনের ঐতিহাসিক এ অনুলিপিটি সংরক্ষিত আছে আল-আকসার কুব্বাতুস সাখরায়। রৌপ্যখচিত আবলুস কাঠে নির্মিত বর্গাকৃতির একটি বাক্সে হাদিয়াটি পাঠিয়েছিলেন সুলতান। বাক্সের  ভেতরের অংশ ৩০টি পাঠাতনে বিভক্ত। যেগুলোতে সংরক্ষিত আছে কোরআনের পৃথক ৩০টি পারা। বর্গাকৃতির বাক্সে সংরক্ষিত থাকায় এটিকে ‘মরক্কোর রাবা’ও বলা হয়। আরবিতে ‘রাবা’ অর্থ বর্গাকৃতি।

আল-আকসায় ওয়াকফ করে সুলতান আল মারিনি অসিয়ত করেছিলেন, শুধু কুব্বাতুস সাখরার ভেতরেই প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সময় অনুলিপিটি তিলাওয়াত করা হবে। তিলাওয়াতের আগে-পড়ে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক, সুরা নাস ও সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত বিশেষভাবে পড়তে হবে। তিলাওয়াত শেষে রাসুলে করিম (সা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি দরুদ এবং সুলতানের পরিবারের জন্য কল্যাণ ও ক্ষমার দোয়া করতে যেন কোনো পাঠকই ভুল না করে।

মুসলিম শাসকদের পক্ষ থেকে সময়ে সময়ে আল-আকসায় বহু হাদিয়া পাঠানো হয়েছে। তবে কস্তুরী মিশ্রিত জাফরান কালিতে একজন সুলতানের নিজ হাতে তৈরি করে পাঠানো কোরআনের অনুলিপিকে বিশেষ উপহার হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। অবশ্য কোরআনের ঐতিহাসিক এ অনুলিপির শিল্পমান এবং এর বিন্যাসশৈলী নিয়ে এ যাবত পর্যাপ্ত একাডেমিক গবেষণা হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন ফিলিস্তিনি পাণ্ডুলিপি গবেষক সমর বাকিরাত। তিনি মরক্কোর মারিনি যুগে কোরআনের প্রতিলিপি বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। সমর বাকিরাত জানান, সুলতান আল মারিনি উন্নত চামড়ায় বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এ পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছেন। যেন কাগজের মতো সহজেই ক্ষয় না হয়ে যায়। লেখার ক্ষেত্রে কুফি লিখনরীতি এবং বিন্যাসের ক্ষেত্রে বিশেষ ফিতার সাহায্যে জ্যামিতিক নানা সূত্র অনুসরণ করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, ঐতিহাসিক এ পাণ্ডুলিপির কালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কস্তুরী মিশ্রিত জাফরান, যাতে কার্বন এবং স্বর্ণ মিশ্রিত কালিও পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিল। কোনো সুরা বা পারার শুরু-শেষে বিশেষ আলংকারিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি পৃষ্ঠায় কারুকাজের মাধ্যমে বিশেষ নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে গত শতকের প্রথম দিকে ফিলিস্তিন নিয়ে নানামাত্রিক অস্থিরতা তৈরি হলে ঐতিহাসিক এ পাণ্ডুলিপির ছয়টি অংশ লুট হয়ে যায়। বর্তমানে ২৪ পারা অবশিষ্ট আছে। কোরআনের ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি ধারণকৃত ‘মরক্কান রাবা’ তৎকালীন মারিনি শাসকদের উৎকর্ষের প্রতীক। পাশাপাশি সুলতান আলী আবুল হাসান আল মারিনির উন্নত রুচিবোধ এবং নিবিষ্টতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

 

তথ্যসূত্র : আলজাজিরা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা