kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

ক্ষুধামুক্তির পথ দেখায় ইসলাম

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বাংলাপিডিয়ায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক. পরিবার ও গোটা জাতির প্রয়োজনীয় মোট খাদ্যের প্রাপ্যতা, খ. স্থানভেদে বা ঋতুভেদে খাদ্য সরবরাহের যুক্তিসংগত স্থায়িত্ব, গ. নির্বিঘ্ন ও মানসম্মত পরিমাণ খাদ্যে প্রত্যেক পরিবারের ভৌত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবাধ অধিকারের নিশ্চয়তা।

ইসলাম জীবনের জন্য জীবিকার তাৎপর্য স্বীকার করে। তবে জীবন-জীবিকার চাবিকাঠি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর হাতে সেটা মানুষকে প্রথমে শিক্ষা দিয়েছে। যেন মানুষ সম্পদের মোহ থেকে মুক্ত থাকে এবং আল্লাহর নির্দেশমাফিক মানবকল্যাণে ব্যয় করে। বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর ঘোষণা—‘ভূপৃষ্ঠের সব প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। তিনি তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্পর্কে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে সব আছে।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬)

মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনার জন্য দায়ী সুষম বণ্টনব্যবস্থা, মানুষের দায়িত্ব সচেতনতার অভাব ও কর্মবিমুখিতা ইত্যাদি। সম্পদের সুষম বণ্টন প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের নীতি হলো—‘তাদের সম্পদে দরিদ্র ও বঞ্চিতদের অধিকার আছে।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৯)

মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ইসলামে ‘উশর’ ও ‘খিরাজ’ নামে মুসলমানের ওপর ফসলি করারোপ করা হয়েছে। এটা ইসলামের একটি বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন ফসল পাকে, তখন তা খাও এবং ফসল কাটার দিন তা থেকে আল্লাহর হক আদায় কোরো।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪১)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যা আমি তোমাদের জন্য জমি থেকে উৎপন্ন করেছি তা থেকে পবিত্র (উত্তম) অংশ খরচ কোরো। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৭)

সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রম ও ব্যয়ে উৎপন্ন ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ উশর আদায় করতে হয়। তবে ইমাম আবু হানিফার (রহ.) মতে ফসলের পরিমাণ যা হোক তা থেকেই উশর আদায় করতে হবে। ইমাম শাফি (রহ.) এর ন্যূনতম পরিমাণ ঠিক করেছেন ২৬ মণ ২৮ সের ৯ ছটাক, অর্থাৎ সাড়ে ৬ কুইন্টাল ৭৫৫ গ্রাম।

 

মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ইসলামের ভূমিনীতি উৎপাদনমুখী। প্রিয় নবী (সা.)-এর ভূমিনীতি ছিল—‘যে মালিকানাহীন ভূমি আবাদ করল সে এর মালিকানার অগ্রাধিকার পাবে।’ অন্যদিকে ফসলের ভাগ পাওয়ার শর্তে শ্রম ও অন্যান্য উপকরণ বিনিয়োগের অংশীদারি বা ‘বর্গা চাষ’ পদ্ধতির কারণে ভূমিহীনের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। কেননা, প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘যার অতিরিক্ত জমি আছে, তা সে নিজে চাষ করবে, অথবা অন্যকে দিয়ে চাষ করাবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)

সমাজের অনগ্রসর অভাবী মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামের ইবাদতমুখী চেতনার অংশ। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘সে প্রকৃত ঈমানদার নয়, যে পেট ভরে খায় আর তার প্রতিবেশী অভুক্ত রাত কাটায়।’ (সুনানে বায়হাকি)

ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে ইসলামী আদর্শ হলো সুদবিহীন ও জাকাতভিত্তিক ব্যবস্থা। ২.৫ শতাংশ জাকাত দানে ৫ শতাংশ হারে দারিদ্র্য বিমোচনের ফলে খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রা.)-এর সময়ে জাকাত গ্রহণের মতো গরিব খুঁজে পাওয়া যায়নি, নিশ্চিত হয়েছে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা। বস্তুত একের ভোগলিপ্সাই অন্যের ভোগান্তির জন্য দায়ী। মানুষের সীমাহীন লিপ্সায় তৈরি হয় ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অনাচার ও অপরাধপ্রবণতা। অন্যদিকে সামষ্টিক দায়িত্বশীল আচরণে অসাধ্য সাধন হয় সহজতর। প্রিয় নবী (সা.) খাদ্য গ্রহণে সামাজিক সম্প্রীতি ও সুষম বণ্টন নিশ্চিতকরণের শিক্ষা দিয়ে বলেন, ‘দুজনের খাবার তিনজনের জন্য যথেষ্ট, তিনজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট।’ (সহিহ বুখারি)

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা