kalerkantho

শনিবার। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৫ ডিসেম্বর ২০২০। ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২

দাঁতের যত্নে নবীজির গুরুত্ব ও উৎসাহ

মুফতি আব্দুল্লাহ আল ফুআদ   

২০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দাঁতের যত্নে নবীজির গুরুত্ব ও উৎসাহ

দাঁত মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, সেগুলো এই দাঁতের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। তাই দেহের অনেক রোগ-জীবাণুর সঙ্গে দাঁতের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। দাঁত বা দাঁতের মাড়ি রোগাক্রান্ত হলে শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গবেষণায় বলা হচ্ছে, অবহেলিত দীর্ঘমেয়াদি দাঁত ও মাড়ির রোগ থেকে সংক্রামক রক্তবাহিকায় মিশে শরীরের অন্যত্র চলে যায়। বিশেষ করে হার্ট, মস্তিষ্ক, ফুসফুস উল্লেখযোগ্য। হাড়ের ক্ষয়রোগ, ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিনের কার্যকারিতা হ্রাসসহ নানা সমস্যার সঙ্গে দাঁত ও মাড়ির রোগের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। সুতরাং শারীরিক সুস্থতার জন্য দাঁতের পরিচর্যা ও যত্নের বিকল্প নেই।

নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার রাখা, দাঁতের ময়লা ও দুর্গন্ধ দূর করতে সচেষ্ট থাকা রাসুল (সা.)-এর একটি বিশেষ সুন্নত। দাঁতের যত্নের এই প্রক্রিয়ায় গাছের শিকড় জাতীয় মিসওয়াকই ছিল রাসুল (সা.)-এর একমাত্র মাধ্যম। তিনি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিত এই মিসওয়াকের আমল করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামদেরও মিসওয়াক করার প্রতি উৎসাহ দিতেন। কয়েকটি হাদিসের মাধ্যমে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) রাত-দিনের যখনই ঘুম থেকে জাগ্রত হতেন অজুর আগে মিসওয়াক করে নিতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫৭)

উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ঘরে প্রবেশের পর সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন। (মুসলিম, হাদিস : ২৫৩)

জায়েদ বিন খালেদ (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) কোনো নামাজের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মিসওয়াক করে নিতেন। (তবারানি, হাদিস : ৫২৬১)

ইসলামে মিসওয়াকের গুরুত্ব কতটুকু তা রাসুল (সা.)-এর এই হাদিসের মাধ্যমে জোরালোভাবে অনুভূত হয়। এক হাদিসে তিনি ইরশাদ করেন, ‘যদি আমার উম্মতের জন্য কঠিন না হতো, তাহলে প্রতি নামাজের সময় মিসওয়াক করাকে আমি অপরিহার্য করে দিতাম।’ (বুখারি,   হাদিস : ৮৮৭)

মিসওয়াক একটি স্বাস্থ্যকর সহজ সুন্নত। দাঁতের যত্ন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি সুন্নতি এ মিসওয়াকের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন হয়। এক হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা মিসওয়াক করো। কেননা তা মুখের পবিত্রতার উপায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৮৯)

 

মিসওয়াক নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর

আধুনিক পৃথিবীতে দাঁত পরিচর্যার প্রচলিত মাধ্যম টুথব্রাশ হলেও এর নেতিবাচক দিক রয়েছে। কারণ সঠিক মাত্রার টুথব্রাশ না হলে কিংবা ব্যবহার পদ্ধতি না জানলে অনেক ক্ষেত্রে দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার টুথব্রাশের দীর্ঘ ব্যবহারে ব্রাশে জমে থাকা জীবাণু দাঁতে নানা রকমের প্রদাহ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে মিসওয়াক অনেকটাই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত।

কারণ বিভিন্ন গাছের ডাল দিয়ে তৈরি মিসওয়াকে রয়েছে উপকারী বহু রাসায়নিক উপাদান। যেমন—ট্রাইমিথাইলঅ্যামিন, সালভাডোরাইন, অ্যালকালয়েড, ফ্লোরাইড, সিলিকা, সালফার, ভিটামিন ‘সি’, ফ্লেভোনয়েডস এবং স্টেরলস পদার্থ। তা ছাড়া মিসওয়াকে আছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস, যা শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তা ছাড়া মিসওয়াকের আঁশগুলো খুবই নরম ও মসৃণ হয়।

 

টুথব্রাশ দিয়ে কি মিসওয়াকের সুন্নত আদায় হবে?

মিসওয়াকের সুন্নতের দুটি দিক আছে। এক. দাঁতের পরিচ্ছন্নতা; যেমন—কয়েক দিন মিসওয়াক না করার দরুন মুখে দুর্গন্ধ হলে তা মাকরুহ। দুই. আরেকটি দিক হলো মিসওয়াক করার মাধ্যম, যার দ্বারা দাঁত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হবে।

টুথপেস্ট, ব্রাশ ও মাজন দিয়ে মিসওয়াক করার ক্ষেত্রে মিসওয়াকের সুন্নতের প্রথম দিকটি আদায় হবে। ইমাম নববি (রহ.) বলেন,  দাঁতের দুর্গন্ধ ও ময়লা দাগ পরিষ্কার করার জন্য যেকোনো জিনিস দিয়ে মিসওয়াক করলেই দুর্গন্ধ থেকে মুক্ত করার সুন্নত আদায় হয়ে যায়। (শরহে মাজহাব : ১/২৮১)

কিন্তু দ্বিতীয় সুন্নতটি আদায় তখনই হবে, যখন মিসওয়াকটি রাসুল (সা.)-এর মিসওয়াকের মতো (লাকড়ির) হবে। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল : ১/৬৫)

আল্লাহ আমাদের দাঁত পরিচর্যায় নবীজির পূর্ণাঙ্গ সুন্নত পদ্ধতি অবলম্বন করার তাওফিক দান করুন।

 

লেখক : মুদাররিস, মারকাযুত তাকওয়া ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা।

 

মন্তব্য