kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সাম্প্রতিক মুসলিম বিশ্ব

এরদোয়ান ও নতুন মধ্যপ্রাচ্যের স্বপ্ন

আবরার আবদুল্লাহ   

১৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এরদোয়ান ও নতুন মধ্যপ্রাচ্যের স্বপ্ন

ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরব আনুকূল্য লাভের যেসব কারণ উল্লেখ করেছিলেন তার অন্যতম ‘তুরস্কের ব্যাপারে আরব-ইসরায়েলের অভিন্ন উদ্বেগ’। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে আরব শাসকদের ভেতর যেমন উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক তেমনি আরব জনগণের ভেতর তুরস্ক ও এরদোয়ানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে হু হু করে। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এমনটিই তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘মিসরকে সঙ্গে নিয়ে উপসাগরীয় অধিকাংশ আরব দেশ তুরস্ককে কোণঠাসা করার উপায় খুঁজতে তত্পর হলেও সিংহভাগ আরব জনগণ মনে করছে যে তুরস্কের রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানই তাদের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী।’ প্রায় ৬০ শতাংশ আরব মনে করে লিবিয়া, সিরিয়া, ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি আরব স্বার্থের অনেক বেশি অনুকূল।

কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি আরব শাসকদের অস্বস্তির অন্যতম প্রধান কারণ। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতিকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করছেন। কাতারের বিরুদ্ধে চার আরব রাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের অন্যতম শর্ত ছিল কাতার থেকে তুর্কি সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহার। আরব রাষ্ট্রগুলোর চাপের মুখে সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহারের বিপরীতে তা আরো শক্তিশালী করেছে কাতার-তুরস্ক। অবশ্য এরদোয়ান বরাবরই কাতারে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতিকে শান্তিপূর্ণ দাবি করে আসছেন। এরদোয়ান বলেন, ‘কাতারে তাদের উপস্থিতি দুই রাষ্ট্রের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার নিদর্শন।’ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরো বলেন, ‘বিশৃঙ্খলাপ্রত্যাশী ছাড়া কারো উপসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্ক ও তুর্কি সামরিক উপস্থিতিতে বিরক্ত হওয়ার কারণ নেই।’ অন্যদিকে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা তুর্কি উপস্থিতিকে ঔপনিবেশিক তত্পরতা হিসেবেই উল্লেখ করছে। সৌদি শিক্ষাবিদ আহমদ আল-কোবাইবান বলেন, ‘একটি ঔপনিবেশিক শক্তি উপসাগরীয় অঞ্চলে তার ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য ফিরে পেতে জোর তত্পরতা চালাচ্ছে।’

শাসকদের তুর্কিবিরোধী তত্পরতার পরও আরববিশ্বে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জনপ্রিয়তার কারণ কী? আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা এর পেছনে যেসব কারণ উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে আছে ফিলিস্তিনের পক্ষে এরদোয়ানের জোরালো অবস্থান, সিরিয়ার লাখ লাখ শরণার্থীকে নিজ দেশে আশ্রয় ও মানবিক সেবা প্রদান এবং হাজার হাজার আরব শিক্ষার্থীকে তুরস্কে বিনা খরচে লেখাপড়ার সুযোগ দান, আরববিশ্বে পশ্চিমাদের অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ, আমেরিকা ও রাশিয়ার মতো বিশ্বশক্তির বিরুদ্ধে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ ইত্যাদি। আরব জনগণ মনে করছে, দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে আরব শাসকরা ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, ক্ষমতা রক্ষার জন্য তারা জনগণের কণ্ঠরোধ করছে, অন্যায়ভাবে সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া ও ইয়েমেনের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে এবং সেখানে পশ্চিমা স্বার্থে কাজ করছে। বিপরীতে তুরস্ক আরব জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে সোচ্চার আছে। বিশেষত আরব বসন্তের পর আরব শাসকরা যখন আরববিশ্বে মুসলিম জাগরণের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন, তখন এরদোয়ান ইসলামপন্থীদের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।

লন্ডনে রাজনৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কিত গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রধান সামি হামদির বক্তব্যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। তিনি মনে করেন, তুরস্ক রাষ্ট্রের চেয়ে ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যে সাধারণ আরব জনগণের বিরাট একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছেন, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

আরবরা এখন দেখছে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তুরস্কের সেই অবস্থান বদলে দিয়েছেন। মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তিউনিসিয়া এমনকি সৌদি শাসকরা যখন আরবদের চিরাচরিত মুসলিম পরিচিতি এবং সত্তাকে খাটো করার চেষ্টা করছেন, এরদোয়ান তখন মুসলিম পরিচিতি তুলে ধরতে দ্বিধাহীনভাবে সোচ্চার। এটা আরববিশ্বের বহু মানুষকে আকৃষ্ট করছে।

মূলত আরব মুসলিমরা এরদোয়ানের চোখে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের স্বপ্ন দেখছে। সে স্বপ্ন কতটা সত্য হবে তা সময়ই বলে দেবে।

তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা, মিডলইস্ট মনিটর ও টিআরটি ওয়ার্ল্ড

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা