kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অর্থনীতিতে সুকুকের অমিত সম্ভাবনা

ড. মুহাম্মাদ মোহন মিয়া   

২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অর্থনীতিতে সুকুকের অমিত সম্ভাবনা

আর্থিক সম্পদ হিসেবে সুকুকের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে। বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশে সুকুকের ব্যবহার ওই সব দেশের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে গতির সঞ্চার করেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক আর্থিক সম্পদের মধ্যে সুকুকের ভাগ রয়েছে ১৭ শতাংশ। অঙ্কের হিসাবে সুকুকের আকার ৩২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ‘আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং’ নামীয় আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টিং ফার্ম সুকুকের আকার নিয়ে উচ্চ ধারণা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আগামী পাঁচ বছরে সুকুকের বাজার বেড়ে ৯০০ বিলিয়ন ডলারে উপনীত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।

বিশ্বব্যাপী সুকুকের চাহিদা : বর্তমানে বিভিন্ন দেশে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংস্থানের উৎস হিসেবে সুকুক বন্ডের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। দেশের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুকুক অর্থ জোগানের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া এ ক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক হিসাব মতে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সুকুক ইস্যুকারী দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার অবদান ৩৬.৮ শতাংশ। এরপর রয়েছে সৌদি আরব, যার অংশ ১৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ১৩.৫, তুরস্কের ৮.৭, কুয়েতের ৭.২, আরব আমিরাতের ৫.৯, ইরানের ৪.৪, বাংলাদেশের ৩.৩, কাতারের ২.৪ এবং বাহরাইনের ২.৪ শতাংশ। ১৯৯০ সালে মালয়েশিয়ার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘শেল এমডিএস’ প্রথমবারের মতো ১২৫ মিলিয়ন রিঙ্গিত মূল্যের ইজারা সুকুক ইস্যু করে। এরপর ২০০১ সালে দেশটির স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান কুমপুলান গুথিরি বারহেড ও মালয়েশিয়ান সরকার মিলে বিশ্বের প্রথম বৈশ্বিক করপোরেট সুকুক ইস্যু করে। ২০০২ সালে দেশটি ৬০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বৈশ্বিক সুকুক বাজারে ছাড়ে। মালয়েশিয়ায় ইসলামী ফিন্যান্স বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকায় সুকুকসহ ইসলামী অর্থনীতির অন্যান্য শাখায়ও দ্রুত অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইনে সুকুক চালু হয় ২০০১ সালে। সরকার বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করার জন্য ‘ইজারা সুকুক’ ছেড়ে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে। ২০০৩ সালে কাতার ৭০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সুকুক ছাড়ে। একইভাবে পরবর্তী বছর ২০০৪ সালে বাহরাইন মনিটারি এজেন্সি ২৫০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সুকুক ইস্যু করে। একই বছর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কাজে অর্থের জোগান হিসেবে দুবাই ইসলামী ব্যাংক ৭৫০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ‘ইজারা সুকুক’ বাজারে ছাড়ে। ২০০৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার এবিসি ব্যাংক ও আবুধাবি বাণিজ্যিক ব্যাংক যৌথভাবে জাহাজ নির্মাণে অর্থায়নের জন্য ২৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ‘আল-সাফিনা ইজারা সুকুক’ বাজারে ছাড়ে। জেদ্দাভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থ প্রতিষ্ঠান ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। এই প্রতিষ্ঠান ২০০৪ সালে ‘সুকুক আল-ইসতিসনা’ নামে ৪০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের একটি হাইব্রিড সুকুক ইস্যু করে।

মুসলিম দেশগুলোর বাইরে অনেক অমুসলিম দেশেও সুকুক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এসব দেশের তালিকায় আছে সিঙ্গাপুর, হংকং, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইস্ট ক্যামেরন পার্টনার্স’ ১৬৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ‘মুশারাকা সুকুক’ বাজারে ছাড়ে। ২০০৯ সালে সিঙ্গাপুর প্রথম সার্বভৌম সুকুক চালু করে। ২০১১ সালে রাশিয়ার তাতারিস্তানে সুকুক চালু হয়। ২০১৪ সালে পশ্চিমা দেশ যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো সুকুক বাজারে আসে। একই বছর এশিয়ার দেশ হংকংয়ে ইজারা সুকুক চালু হয়।   

বাংলাদেশে সুকুক সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশে সুকুকের ব্যবহার সীমিত আকারে লক্ষ করা যায়। এখানে স্বল্পমেয়াদি ‘সরকারি ইসলামিক বন্ড’ এবং ‘ইসলামী ব্যাংক মুদারাবা বন্ড’ চালু আছে। তবে বাংলাদেশে সুকুকের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। এর বেশ কয়েকটি কারণ আছে। বাংলাদেশ ‘ইসলামী ফিন্যান্স শিল্প’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চমৎকার অভিজ্ঞতা এবং অগ্রগতি সাধন করেছে। ৩১ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের সম্পদ নিয়ে দেশের ইসলামী ফিন্যান্স বা ইসলামী ব্যাংকিং ও ফিন্যানশিয়াল খাত ১৩১টি দেশের তালিকায় ১৭তম অবস্থানে রয়েছে। দেশের ৫৮টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র আটটি ইসলামী ব্যাংক ২৫ শতাংশ সম্পদ নিয়ে আশ্চর্যজনক সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ, যার ১৫৬ মিলিয়ন মানুষ মুসলিম। তাই সুকুকের বাজার চাহিদা এখানে অনেকটা অনুকূল বলেই ধরে নেওয়া যায়। অথচ এ দেশে সুকুকের বাজার মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক ছোট দেশ থেকে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অনুকূল নীতি প্রণয়ন এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর যথাযথ উদ্যোগ গৃহীত হলে সুকুক বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অভাবনীয় অবদান রাখতে পারে।

বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছেনি। দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের চাহিদা বিবেচনায় অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব মতে (২০১৩ সালে প্রদত্ত) ২০২০ সাল নাগাদ দেশের বিদ্যুৎ খাত, সড়ক এবং পানি ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর ৭.৪ থেকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ প্রয়োজন। তথ্যে আরো বলা হয়েছে, দেশকে উন্নত করতে হলে এর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭.৩৮ থেকে ১০.০২ শতাংশের মধ্যে থাকতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি বর্তমানে ৮.০২ শতাংশ, যা নিকট ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন গতিশীল করতে হবে। দেশকে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলসের (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। অতএব, উন্নয়নের এই কর্মযজ্ঞে প্রয়োজন হবে অধিক পরিমাণ আর্থিক সংগতি। বর্তমানে দেশে বড় বড় প্রকল্প এবং অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এসব খাত বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশ অর্থ জোগানদাতা দেশগুলোর নানা জটিল শর্তের আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প চাহিদা পূরণে সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে আর্থিক জোগান জোরদার করা যেতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদের অতিরিক্ত তারল্য সুকুকে বিনিয়োগের মাধ্যমে একদিকে যেমন উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে, অন্যদিকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ারও বিরাট সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশে সুকুক আর্থিক হাতিয়ার হিসেবে সম্ভাবনার আলো দেখালেও এ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ বাধা হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এসব বাধা ডিঙানো গেলে সুকুক বাজার সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা আরো বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো আইনগত কাঠামোর সংশোধন। সুকুককে জনপ্রিয় করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিক পর্যায়ে বিদ্যমান ‘কর আইনের’ বিশেষ সংশোধন একান্ত জরুরি।

দ্বিতীয়ত, দেশের রেজিস্ট্রেশন আইনে পরিবর্তন আনা বেশ প্রয়োজন। বর্তমান রেজিস্ট্রেশন আইনে যে বড় অঙ্কের ফি নির্ধারিত আছে, তাতে সুকুক থেকে অর্জিত মুনাফার প্রায় পুরোটাই ব্যয় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তৃতীয়ত, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সুকুক পরিচালনার জন্য বাংলাদেশে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনশক্তির খুবই অভাব। এ জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেসব দেশ সুকুক ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে আছে, সেসব দেশের প্রশিক্ষণ গ্রহণে কার্যকর পদক্ষেপ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রণীত হতে হবে। সেই সঙ্গে এ বিষয়ে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের এগিয়ে আসতে হবে, যাতে ইসলামী বন্ডের নীতিমালা যথাযথভাবে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। তা ছাড়া সুকুক সম্পর্কে সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও বাড়ানো প্রয়োজন। এসব বাধা অতিক্রম করা গেলে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আর্থিক হাতিয়ার হিসেবে সুকুকের ব্যবহার এবং এর প্রভূত কল্যাণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। সুকুক বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমরা একটি সমন্বিত উন্নয়নের রোল মডেল তৈরি করতে পারব।

লেখক : রূপান্তর প্রকল্পের সমন্বয়ক, ইসলামী ব্যাংকিং, স্ট্যন্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড এবং

সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড

মন্তব্য