kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ইসলামী ব্যাংকগুলো কিভাবে পুঁজি সংগ্রহ করে

কাসেম শরীফ   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইসলামী ব্যাংকগুলো কিভাবে পুঁজি সংগ্রহ করে

বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। প্রচলিত ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকিং। প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো নানাভাবে পুঁজি সংগ্রহ করে থাকে, কিন্তু ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো শরিয়ার নীতি মেনে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পুঁজি সংগ্রহ করে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংকগুলো সাধারণত ১২ উৎস থেকে তহবিল বা পুঁজি সংগ্রহ করে থাকে। যথা : ১. আল ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব। ২. সাধারণ মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব। ৩. বিশেষ মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব। ৪. সাধারণ মুদারাবা মেয়াদি সঞ্চয়ী হিসাব। ৫. বিশেষ মুদারাবা মেয়াদি সঞ্চয়ী হিসাব। ৬. মুদারাবা শর্ট নোটিশ জমা হিসাব। ৭. অন্য জমা হিসাব (যেমন—বিল গ্রহণ)। ৮. শেয়ার মূলধন। ৯. ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। ১০. কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্য ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণ। ১১. সার্ভিস চার্জ বা কমিশনের ভিত্তিতে সেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ। ১২. ব্যাংকের সঞ্চিতি তহবিল।

(মাওলানা মো. ফজলুর রহমান আশরাফী, ‘সুদ ও ইসলামী ব্যাংকিং কী কেন কিভাবে?’ পৃষ্ঠা ১৯৪)

ইসলামী ব্যাংকগুলোর পুঁজি সংগ্রহের এসব উৎস মৌলিকভাবে তিন নীতির আলোকে হয়ে থাকে। এক. আল-আমানাহ। আল-ওয়াদিয়াহ। তিন. মুদারাবা।

 

আল-আমানাহ কী ও কিভাবে

কোনো কিছু জমা বা গচ্ছিত রাখার একটি পদ্ধতি হলো আল-আমানাহ। ড. ওমর চাপরা বলেন, ‘সম্পদ যে অবস্থায় জমা রাখা হয়েছে, সেভাবে গ্রাহককে ফেরত দেওয়ার নাম আল-আমানাহ।’ (ইসলাম অ্যান্ড দি ইকোনমিক চ্যালেঞ্জ, পৃষ্ঠা : ৩৫৭)

আমানতের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হয়। ১. আমানত যখন চাইবে তখন ফেরত দিতে হবে। ২. গচ্ছিত অর্থ-সম্পদ থেকে কোনোভাবে উপকৃত হওয়া যাবে না। ৩. আমানত রাখা বস্তু যদি নষ্ট হয় এবং এ ক্ষেত্রে আমানত সংরক্ষণকারীর কোনো দুর্বলতা না থাকে, তাহলে তাকে জরিমানা দিতে হবে না। কিন্তু যদি প্রমাণিত হয় যে আমানত সংরক্ষণকারীর কারণেই এই আমানত নষ্ট হয়েছে, তাহলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংকে আল-আমানাহ পদ্ধতিতে জমা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লকার সিস্টেম এ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। ইসলামী ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের মূল্যবান দলিল, স্বর্ণালংকার ইত্যাদি সংরক্ষণের জন্য লকার সুবিধা দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ভাড়া বা সার্ভিস চার্জ হিসেবে অর্থ পেয়ে থাকে।

 

আল-ওয়াদিয়াহ কী ও কিভাবে

আরবি আল-ওয়াদিয়াহ অর্থ সংরক্ষণ করা ও জমা করা। আল-ওয়াদিয়াহ একটি চুক্তি। এখানে দুটি পক্ষ থাকে। জমা গ্রহণকারী ও জমাকারী। ব্যাংকে যে ব্যক্তি অর্থ জমা করে তাকে বলা হয় ‘মুয়াদ্দি’। আর জমা গ্রহণকারী হিসেবে ব্যাংককে বলা হয় ‘মুয়াদ্দা ইলাইহি’। আর জমাকৃত বস্তুকে ‘মুয়াদ্দা’ বলা হয়।

আল-আমানাহ ও আল-ওয়াদিয়ার পার্থক্য হলো, আমানাহর গচ্ছিত অর্থ বা বস্তু ব্যবহার করা যায় না, কিন্তু আল-ওয়াদিয়াহর জমাকৃত অর্থ বা বস্তু আমানতদার ব্যবহার করতে পারে। তা ছাড়া আমানাহর গচ্ছিত অর্থ বা বস্তু অবিকল ফেরত দিতে হয়, কিন্তু আল-ওয়াদিয়াহর জমাকৃত অর্থ বা বস্তু অবিকল ফেরত দিতে হয় না; বরং একই মূল্যমানের অর্থ ফেরত দিতে হয়।

ইসলামী ব্যাংকগুলো চলতি হিসাবে জমাকৃত অর্থ আল-ওয়াদিয়াহ নীতিতে সংগ্রহ করে। বেশির ভাগ মানুষ ব্যাংকে যায় টাকা সংরক্ষণের জন্য, মুনাফা অর্জনের জন্য নয়। ইসলামী ব্যাংকগুলো আল-ওয়াদিয়াহ নীতিতে সেসব মানুষের অর্থ সংগ্রহ করে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় স্মরণীয়— ১. এই হিসাবে জমাকৃত অর্থ গ্রাহক ইচ্ছামতো উত্তোলন করতে পারে। ২. ব্যাংক গ্রাহকের চাহিদামতো জমাকৃত অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য। ৩. আল-ওয়াদিয়াহ নীতিতে হিসাব খোলার সময় ইসলামী ব্যাংকগুলো এই অর্থ ব্যবহারের অনুমতি নেয়। এবং ব্যাংক এই অর্থ বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করতে পারে। ৪. বিনিয়োগকৃত অর্থে লোকসান হলে গ্রাহক তার দায়ভার বহন করে না। ৫. মুনাফার অংশ গ্রাহককে দেওয়া হয় না। ৬. এই হিসাবে লেনদেনের জন্য গ্রাহককে জমা বই ও চেক বই দেওয়া হয়। ৭. ব্যাংক গ্রাহকের চলতি হিসাবে সার্ভিস দেওয়ার জন্য চার্জ দাবি করতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকগুলোর আল-ওয়াদিয়াহ নীতির সঙ্গে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর চলতি হিসাবের মিল আছে। তবে প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে চলতি হিসাবের বিপরীতে অতিরিক্ত উত্তোলন (Overdraft) গ্রহণের সুযোগ আছে, কিন্তু ইসলামী ব্যাংকগুলোতে এই সুযোগ নেই। তা ছাড়া প্রচলিত ব্যাংকগুলো চলতি হিসাবে জমা অর্থ সুদের ভিত্তিতে হালাল-হারাম-নির্বিশেষে যেকোনো খাতে ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু ইসলামী ব্যাংকগুলো শরিয়াহপরিপন্থী খাতে তা ব্যবহার করতে পারে না।

 

মুদারাবা কী ও কিভাবে

মুদারাবা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বহুল পরিচিত একটি পরিভাষা। মুদারাবা অংশীদারি কারবারের একটি পদ্ধতি। ইসলামী শরিয়াহর নীতিমালা অনুযায়ী মুদারাবা একধরনের ব্যাবসায়িক চুক্তি, যেখানে এক পক্ষ অর্থের বা পুঁজির জোগান দেয় এবং অন্য পক্ষ শ্রম, মেধা ও সময় বিনিয়োগ করে ব্যবসা পরিচালনা করে। যে পক্ষ অর্থের জোগান দেয়, তাকে বলা হয় ‘সাহিব আল-মাল’। আর যে পক্ষ শ্রম, মেধা ও সময় বিনিয়োগ করে ব্যবসা পরিচালনা করে তাকে বলা হয় ‘মুদারিব’। অর্জিত লাভ উভয় পক্ষ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভাগ করে নেয়। কিন্তু লোকসান হলে তা শুধু ‘সাহিব আল-মাল’ বহন করে। মুদারিবের কোনো আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হয় না। তার যে শ্রম, মেধা ও সময় নষ্ট হয় এটাই তার ক্ষতি। তবে যদি মুদারিবের অবহেলা বা চুক্তি ভঙ্গজনিত কারণে ব্যবসায় ক্ষতি হয় তাহলে তা মুদারিবকেই বহন করতে হয়।

ইসলামী ব্যাংকগুলো এই মুদারাবা চুক্তির ভিত্তিতে যে জমা গ্রহণ করে তাকে মুদারাবা জমা হিসাব বলা হয়। এ হিসাবের জমাকৃত অর্থ ইসলামী ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ-গ্রাহকদের মধ্যে বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে থাকে। সামগ্রিকভাবে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ ‘সাহিব আল-মাল’ বা জমাকারীদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়।

(পরের কিস্তিতে মুদারাবা নিয়ে বিস্তারিত

আলোচনার আশা রইল, ইনশাআল্লাহ)

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা