kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

হাদিস অন্বেষণে ৩ সাহাবির বিদেশভ্রমণ

মুফতি ইবরাহিম সুলতান   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হাদিস অন্বেষণে ৩ সাহাবির বিদেশভ্রমণ

কিছু মানুষ ভ্রমণপ্রেমী। অর্থ উপার্জন ছাড়াও বিভিন্ন প্রয়োজনে তারা ভ্রমণ করে থাকে। কখনো দেশে, কখনো দূর প্রবাসে। বর্তমানের আধুনিক যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ভ্রমণ অনেক সহজ ও আরামদায়ক হলেও গত শতাব্দীর শুরুতেও তা ছিল অনেক কষ্টসাধ্য। তবু জীবিকা উপার্জনসহ নানা কারণে মানুষ ছুটে যেত দেশ-মহাদেশে। কিন্তু শুধু একটি হাদিস শ্রবণ কিংবা হাদিস নিরীক্ষণের জন্য সাহাবিদের দূরের দেশ পাড়ি দেওয়ার ঘটনা ছিল ইসলামী ইতিহাসে বিরল। রাসুল (সা.)-এর সহজে জান্নাত পাওয়ার আশা-জাগানিয়া হাদিসটি সাহাবিদের বেশ প্রেরণা জুগিয়েছিল। বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি দ্বিনি ইলমের খোঁজে কোনো পথে চলবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেবেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৪৬) এখানে তিন সাহাবির বিদেশভ্রমণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হলো—

 

সাহাবি জাবের ইবনে আবদিল্লাহ (রা.)

হাদিসের প্রতি সব সাহাবির ছিল গভীর ভালোবাসা ও প্রচণ্ড আগ্রহ। তাই নবীজির মৃত্যুর পর পৃথিবীর যেখানেই তাঁরা হাদিসের সন্ধান পেতেন, মুহূর্তেই সেখানে ছুটে যেতেন।

সাহাবি জাবের ইবনে আবদিল্লাহ (রা.)-এর ঘটনা। তিনি বলেন, একবার আমার কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একজন সাহাবির মাধ্যমে একটি হাদিসের সংবাদ পৌঁছে, যা তিনি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছেন। এরপর আমি কালবিলম্ব না করে দ্রুত একটি উট কিনে হাওধা বেঁধে তাঁর উদ্দেশে সফর শুরু করলাম। দীর্ঘ এক মাসের যাত্রা শেষে সিরিয়ায় পৌঁছে দেখলাম তিনি হলেন আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস। আমি দারোয়ানকে বললাম, তাঁকে বলো দরজায় জাবের অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, ইবনে আবদুল্লাহ নাকি? বললাম জি! আমি জাবের ইবনে আবদিল্লাহ। এরপর তিনি ঘর থেকে দ্রুত বের হয়ে আমার সঙ্গে আলিঙ্গন করলেন। অতঃপর আমি বললাম, একটি হাদিসের সংবাদ পেয়েছি, যা আপনি রাসুল (সা.) থেকে শুনেছেন। হাদিসটি শোনার আগে আমার বা আপনার মৃত্যুর আশঙ্কা করছিলাম। তাই দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিয়ে আপনার কাছে শুধু হাদিসটি শোনার জন্য এসেছি। তাই প্রথমেই আপনি আমাকে নবীজির বর্ণনাটি শোনান। তারপর আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন সব মানুষকে বস্ত্রহীন, খতনাবিহীন ও নিঃস্ব অবস্থায় একত্র করবেন।’ (আল আদাবুল মুফরাদ, পৃষ্ঠা ৩৩৭)

 

আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)

আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) নবীজির নিকটতম একজন প্রিয় সাহাবি। মদিনায় নবীজির হিজরতের পর প্রিয় নবীর দেখাশোনাসহ আনুষঙ্গিক অনেক বিষয়ে ছিল তাঁর বড় অবদান। তা ছাড়া হাদিস অন্বেষণে তিনি ছিলেন বেশ অগ্রগামী। নিচের ঘটনাটিই এর বড় প্রমাণ। নবীজির প্রিয় এই সাহাবি একবার শুধু একটি হাদিস শোনার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মদিনা থেকে মিসর সফর করেন। তৎকালীন মিসরের গভর্নর ছিলেন সাহাবি মাসলামা বিন মুখাল্লাদ আনসারি (রা.)। আবু আইয়ুব আনসারিকে দেখে তিনি দ্রুত বের হয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে জিজ্ঞেস করলেন, হঠাৎ এত দূর সফরে কেন এলেন? জবাবে তিনি বলেন, আমি নবীজি থেকে ‘মানুষের দোষ ত্রুটি গোপন রাখা’ বিষয়ক একটি হাদিস শুনেছি। এ হাদিসটি শোনার সময় আমার সঙ্গে অনেকেই ছিল। তবে বর্তমানে উকবাহ বিন আমের জুহানি ছাড়া কেউ জীবিত নেই। তাই কাঙ্ক্ষিত বর্ণনাটি শোনার জন্য এত দূর সফর করে এলাম। আপনি উকবাহ বিন আমেরের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিন। তখন মাসলামা দ্রুত একজন লোক পাঠিয়ে উনাকে এই সংবাদ পৌঁছালেন। উকবাহ বিন আমের (রা.) এই সংবাদ শোনামাত্রই দ্রুত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে হাদিস বর্ণনা শুরু করলেন। তিনি বলেন, আমি নবী (আ.)-কে বলতে শুনেছি যে, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুমিনের দোষ ত্রুটি গোপন রাখবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ ত্রুটি গোপন রাখবেন।’

হাদিসটি শোনার পর আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বলেন, ‘তুমি সত্য বলেছ।’ এ কথা বলেই তিনি দ্রুত সওয়ারির ওপর উঠে মদিনায় ফিরে এলেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৭৩৯১)

 

এক সাহাবির মিসর সফর

আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ (রা.) বলেন, নবীজির এক সাহাবি মিসরে অবস্থানরত ফাজালাহ ইবনু উবাইদ (রা.)-এর নিকট পৌঁছেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমি শুধু আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসিনি; বরং আমি এবং আপনি যে হাদিস রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে শুনেছি, আশা করি এ সম্পর্কে আপনার কিছু জানা আছে। তিনি বলেন, তা কোন বিষয়ে? তিনি বলেন, এরূপ এরূপ।

এরপর তাঁর কাছে উল্লিখিত হাদিস বর্ণনা করেন।

এরপর তিনি (ফাজালাহ) বলেন, আপনি একটি স্থানের নেতা, অথচ আপনার মাথায় চুল উষ্কখুষ্ক দেখছি? সাহাবি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাত্রাতিরিক্ত জাঁকজমক দেখাতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, আপনার পায়ে জুতা দেখছি না কেন? তিনি বলেন, নবী (সা.) আমাদের মাঝেমধ্যে খালি পায়ে চলার আদেশ দিতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪১৬০)

মহান আল্লাহ আমাদের হাদিসের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং হাদিস অন্বেষণে দেশ-বিদেশে সফর করার তাওফিক দান করুন।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, উলুমুল হাদিস বিভাগ, মারকাজুল বুহুস আল-ইসলামিয়া আফতাবনগর, বাড্ডা, ঢাকা।

মন্তব্য