kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সংকটময় দিনগুলোতে ধৈর্য

মুফতি সাইফুল ইসলাম   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নানাবিধ উপায় উপকরণের এই পৃথিবীতে চলার পথে কখনো এমন সব বিপদ, বিপর্যয় আর বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়; যা থেকে উত্তরণের উপায় জানা নেই। শুরু হয় ভাবনার সমুদ্রে উত্তাল তরঙ্গ আর অস্থির ছোটাছুটি। বিপদ কখনো কখনো ধৈর্যের বাঁধ এমনভাবে ভেঙে দিতে চায় যে, তখন মনে হয় ‘আর কত ধৈর্য ধরব’। এই মহা সংকট থেকে উত্তরণের হয়তো আর কোনো সম্ভাবনাই নেই। এটি ভুল ধারণা। কারণ ঠিক সেই কঠিনতম সময়েও মহান আল্লাহ আপনার সঙ্গে আছেন। যদি আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেন। তিনিই এমনভাবে আপনাকে বিপদমুক্ত করবেন, যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। মনে রাখতে হবে, এই বিপদের মুক্তি আল্লাহ তাআলা ধৈর্যের মধ্যেই নিহিত রেখেছেন।

পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে—সুরা আলে ইমরানের ২০০তম আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর।’ সুরা জুমারের ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ধৈর্যশীলদের অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হবে।’ সুরা বাকারার ১৫২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’

কোরআনে বর্ণিত ধৈর্যের আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘সবর’। এর আভিধানিক অর্থ বিরত রাখা ও বাধা দেওয়া। আর কোরআন ও সুন্নাহর পরিভাষায় এর অর্থ নফসকে তার প্রকৃতিবিরুদ্ধ বিষয়ের ওপর জমিয়ে রাখা। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) ‘সবর’-এর তিন প্রকার বর্ণনা করেছেন—১. ‘সবর আলাত্ত্বাআত’, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল যেসব কাজের হুকুম করেছেন, সেগুলোর অনুবর্তিতা মনের ওপর যত কঠিনই হোক না কেন, তাতে মনকে স্থির রাখা। ২. ‘সবর আনিল মাআসি’, অর্থাৎ যেসব বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল নিষেধ করেছেন, সেগুলো মনের জন্য যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, যত স্বাদেরই হোক না কেন, তা থেকে মনকে বিরত রাখা। ৩. ‘সবর আলাল মাসায়েব’ অর্থাৎ বিপদ-আপদ ও কষ্টের বেলায় সবর করা, ধৈর্য ধারণ করা, অধৈর্য না হওয়া এবং দুঃখ-কষ্ট ও সুখ-শান্তিকে আল্লাহরই পক্ষ থেকে আগত মনে করে মন-মস্তিষ্ককে সে জন্য অধৈর্য করে না তোলা।

সুরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আমি তোমাদেরকে অবশ্যই পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের।’

যেহেতু আল্লাহ তাআলা সমগ্র উম্মতকে লক্ষ্য করেই পরীক্ষার কথা বলেছেন, সেহেতু সবার পক্ষেই অনুধাবন করা উচিত যে এ দুনিয়া দুঃখ-কষ্ট সহ্য করারই স্থান। সুতরাং এখানে যেসব সম্ভাব্য বিপদাপদের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে অপ্রত্যাশিত কিছু মনে না করলেই ধৈর্য ধারণ করা সহজ হতে পারে। মূলত মানুষের ঈমান অনুসারেই আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা, বিপদাপদ, বালা-মুসিবত নবীগণকে প্রদান করেন। তারপর যারা তাদের পরের লোক, তারপর যারা এর পরের লোক, তারপর যারা এর পরের লোক।’ (মুসনাদে আহমাদ ৬/৩৬৯)

অর্থাৎ প্রত্যেকের ঈমান অনুসারেই তাদের পরীক্ষা হয়ে থাকে। তবে পরীক্ষা যেন কেউ আল্লাহর কাছে কামনা না করে; বরং সর্বদা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করাই মুমিনের কাজ।

রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করার চেষ্টা করবে আল্লাহ তাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা প্রদান করবেন। আর কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দান দেওয়া হয়নি, যা ধৈর্য অপেক্ষা উত্তম। (বুখারি, হাদিস : ১৪৬৯)

এ কারণে যুগে যুগে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেছেন। সবচেয়ে বেশি এবং বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন নবী-রাসুলরা।

আল্লাহর প্রিয় বন্ধু মুহাম্মদ (সা.)-কেও দুনিয়ার জীবনে পদে পদে অসংখ্য বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবু সবখানেই ছিল ধৈর্যের সরব উপস্থিতি। প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে আসা, ২৩টি যুদ্ধ পরিচালনা করা, সুবিশাল কাফের গোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামের আলো জ্বেলে দেওয়া, কাবাঘরকে মুক্ত করে আনাসহ সর্বত্রই ছিল ধৈর্যের অগ্নিপরীক্ষা।

সুতরাং মুমিন হতে হলে ধৈর্যকেই সঙ্গী করতে হবে সব কিছুর আগে। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি তাঁর নির্দেশনা মানতে হবে ধৈর্যের সঙ্গেই। তাই আসুন জীবনের সবখানে সব আয়োজনে আল্লাহর নির্দেশিত এই ধৈর্যই হোক আমাদের উত্তরণের উপায়।

লেখক :  প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও মুহাদ্দিস

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা