kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

মসজিদসংলগ্ন ধর্মীয় শিক্ষা কিভাবে চলবে

মুফতি মাহমুদ হাসান   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মসজিদসংলগ্ন ধর্মীয় শিক্ষা কিভাবে চলবে

একটি হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদ বানানোর উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, এই মসজিদগুলো বানানো হয়ে থাকে আল্লাহর স্মরণ ও আলোচনা, নামাজ ও কোরআন পাঠের জন্য। (মুসলিম, হাদিস : ২৮৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১২৯৮৪)

উপরোক্ত উদ্দেশ্যগুলোর অপরিহার্য সহায়ক ও সম্পূরক হিসেবে দ্বিনি ইলম তথা শরয়ি জ্ঞানচর্চাও মসজিদের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর অন্যতম। এ জন্যই নবী করিম (সা.)-এর যুগে মসজিদ-ই-নববীর চবুতরায় ‘সুফফা’ নামক স্থানে সর্বদা দ্বিনি ইলম শিক্ষাদান চলত। যুগে যুগে সাহাবা-তাবেইন ও পরবর্তী যুগেও মসজিদে ও মসজিদসংলগ্ন জায়গায় দ্বিনি ইলম চর্চা ও শিক্ষাদান তথা দ্বিনি মাদরাসার কর্মসূচি অব্যাহত ছিল।

 

যুগে যুগে দ্বিন শিক্ষার মজলিস

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করিম (সা.) থেকে শুনেছি, যে ব্যক্তি আমার এই মসজিদে একমাত্র দ্বিন শিক্ষাগ্রহণ অথবা শিক্ষাদানের জন্য আসবে, তার মর্যাদা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণকারীর মতো হবে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৭)

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কোনো এক কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে মসজিদে প্রবেশ করেন। তখন সেখানে দুটি সমাবেশ চলছিল। একটি সমাবেশে লোকজন কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকিরে মশগুল ছিল এবং অন্য সমাবেশে লোকজন শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানে রত ছিল। নবী করিম (সা.) বলেন, সবাই কল্যাণকর তৎপরতায় রত আছে। এই সমাবেশের লোকজন কোরআন তিলাওয়াত করছে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করছে। তিনি চাইলে তাদের দান করতেও পারেন আবার চাইলে নাও দিতে পারেন। অন্যদিকে এই সমাবেশের লোকেরা শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানে রত আছে। আর আমি শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি। অতঃপর তিনি এদের সমাবেশে বসলেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৯)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর একটি বর্ণনায়ও সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে কোরআন, হাদিস, ফিকহ ও জরুরি দ্বিনি মাসায়েল শিক্ষার আসর নিয়মিত চালু থাকার ঘটনা উল্লিখিত হয়েছে। (আলমুজামুল আওসাত, হাদিস : ১৪২৯)

আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-ও মসজিদভিত্তিক দ্বিনি শিক্ষা কার্যক্রমকে মুসলিম জাতির জন্য কল্যাণকর হিসেবে উল্লেখ করে গুরুত্ব দিয়েছেন। (হায়াতুস সাহাবা : ৪/১৭০)

তবে পরবর্তী যুগে ধীরে ধীরে পরিচালনার সুবিধার্থে স্বতন্ত্র দ্বিনি মাদরাসার গোড়াপত্তন হলেও মসজিদভিত্তিক দ্বিনি ইলম চর্চা ও শিক্ষাদান আজ পর্যন্ত চলমান। এর কারণ হলো মুসলিম উম্মাহর দ্বিনি কেন্দ্র মসজিদের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দ্বিনি শিক্ষার প্রচার-প্রসার। এ জন্যই যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর ঐতিহাসিক বড় বড় বিদ্যাপীঠ ও বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। কারাউন বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসায়ে নিজামিয়া, জামিয়াতু কুরতুবাহ, মাদরাসায়ে আবি হানিফা ও জামিয়াতুল আজহারসহ অনেক ঐতিহাসিক মাদরাসা ও ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রাথমিকভাবে মসজিদকেন্দ্রিকই শুরু হয়েছিল। (আখবারুল উন্দুলুস, পৃষ্ঠা ২৫৪, তারিখে ইসলাম পর এক নজর, পৃষ্ঠা ২৪৫, তারিখে ফাতিমিয়্যিন, পৃষ্ঠা ৩২৯)

 

মসজিদে দ্বিনি শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার শরয়ি বিধান

ওপরে বর্ণিত হাদিস ও সাহাবা তাবেয়িনদের কর্মপন্থার আলোকে প্রমাণিত হয় যে মসজিদের আদব রক্ষা করে মসজিদে দ্বিনি শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা বৈধ। তবে সেখানে তালেবে ইলম ও শিক্ষকদের আবাসিক থাকার বিষয়ে ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হচ্ছে, কোনো এলাকায় মসজিদের বাইরে অন্যত্র স্বতন্ত্র জায়গার ব্যবস্থা না হলে প্রয়োজনে তালেবে ইলম ও শিক্ষকরা আবাসিকও থাকতে পারবে, কিন্তু তখন ইতেকাফের নিয়তে সর্বদা অবস্থান করবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের আদব-ইহতেরামের প্রতি পুরোপুুরি লক্ষ রাখা জরুরি। (তিরমিজি, হাদিস : ৩২১; মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৪৯৫৮; খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ১/২২৯)

 

মসজিদের জায়গায় মাদরাসা স্থাপন

মসজিদের বাইরে মসজিদের অতিরিক্ত খালি জায়গায় দ্বিন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার প্রতি লক্ষ রেখে মসজিদের অধীন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা যাবে। তবে সে মাদরাসার অস্তিত্ব থাকবে মসজিদসংশ্লিষ্ট হিসেবে। কেননা মুসলিম উম্মাহর দ্বিনি কেন্দ্র  মসজিদের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দ্বিনি শিক্ষার প্রচার-প্রসার। ওই উদ্দেশ্য সামনে রেখে কোরআন-হাদিস, তাফসির, ফিকহসহ অন্য দ্বিনি শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা যাবে। তবে মসজিদ সম্প্রসারণ বা অন্য কোনো কাজে ওই জায়গা মসজিদের প্রয়োজন হলে ওই মাদরাসা মসজিদ কর্তৃপক্ষ স্থানান্তর করতে পারবে। কেননা মাদরাসাটি হলো মসজিদের আওতাধীন একটি শাখা প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালিত। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৭, কিফায়াতুল মুফতি : ৭/৩২)

বাকি রইল স্বতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার বিধান। তার বিধান হলো, শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি ওয়াকেফর উদ্দেশ্যপরিপন্থী কাজে ব্যবহার করা এবং তদ্রূপ ওয়াকেফর কাজে পরিবর্তন করা নাজায়েজ। তাই মসজিদের ওয়াকেফর জায়গায় স্থায়ীভাবে স্বতন্ত্র মাদরাসা স্থাপন করা যাবে না। তবে মসজিদের বাইরে মসজিদের অতিরিক্ত জায়গায় স্বতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে ওই জায়গার ভাড়া মাদরাসা কর্তৃপক্ষ থেকে মসজিদ গ্রহণ করবে। এভাবে স্বতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা যায়। তখন মাদরাসার অস্তিত্ব স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ৫/৩২১, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১৫/১৯৭, ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া ৯/২৩৯)

           লেখক : ফতোয়া গবেষক

ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা