kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

একটি বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি

কাসেম শরীফ

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একটি বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি

আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) একজন ক্ষণজন্মা মুসলিম মনীষী। মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক মুরব্বি। লাখো হাফেজ-আলেমের দেশে তিনি ছিলেন আলেমকুলের শিরোমণি। তাঁর মহাবিদায় শুধু একটি প্রাণের দেহান্তর নয়, একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। আল্লামা আহমদ শফী একটি নাম, একটি ইতিহাস। বহু স্রোতের অভিন্ন মোহনা তৈরি হয়েছিল তাঁকে ঘিরে। বহু পথ সংযুক্ত হয়েছিল তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে। বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার আদায়ে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, ইতিহাসে তাঁর নজির মেলা ভার। আল্লামা শফী বাংলাদেশের ঘুমন্ত মুসলমানদের জাগিয়ে তুলেছিলেন। হয়ে ওঠেন মুসলিম জাগরণের মহাপ্রতীক।

বিরল ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বগুণ ও অনুকরণীয় জীবন-দর্শনে তিনি কোটি মানুষের হৃদয়রাজ্যে সমাসীন হয়েছেন।

১৯২০ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার পাখিয়ারটিলা গ্রামে জন্ম নেওয়া শিশুটি জীবনের সমাপ্তি পর্বে এক বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর চিরচেনা আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায় অধ্যয়ন শেষে ১৯৪১ সালে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় ভর্তি হয়ে হাদিস, তাফসির ও ফিকহশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এ সময় তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর স্নেহ, সান্নিধ্য ও দীক্ষা লাভ করেন।

ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে ১৯৪৬ সালে দারুল উলুম হাটহাজারীতে শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৮৬ সালে জামিয়ার সর্বোচ্চ পরিষদ মজলিসে শুরার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহাপরিচালক পদ অলংকৃত করেন। তাঁর জীবনের অন্যতম কীর্তি হলো তিনি ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে হাদিসের দরস (অধ্যাপনা) দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন শিক্ষক। এর পাশাপাশি তিনি উর্দু ও বাংলা ভাষায় প্রায় ২৫টি গ্রন্থ রচনা করেন। ধীরে ধীরে হাটহাজারীর ছোট্ট পল্লী পেরিয়ে তাঁর সুনাম, শিষ্য ও ভক্তবৃন্দের সংখ্যা দেশ-বিদেশে বাড়তে থাকে। স্রোতধারার মতো তা বয়ে যায় শহর থেকে গ্রামে। তিনি পরিণত হন মুকুটহীন সম্রাটে। তিনি ‘শায়খুল ইসলাম’ উপাধিতে ভূষিত হন।

২০০৮ সালে তিনি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯ জানুয়ারি ২০১০ সালে দারুল উলুম হাটহাজারী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওলামা সম্মেলনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ গঠিত হয়। তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আমির মনোনীত হন। ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শায়খুল ইসলামের একটি খোলা চিঠি বাংলার তৌহিদি জনতাকে জাগিয়ে তোলে। জন্ম হয় একটি নতুন ইতিহাসের। জন্ম হয় একজন নতুন আহমদ শফীর। দেশ ও জাতির ভয়াবহ সংকট উত্তরণ ও ঈমান-ইসলামের হেফাজতের জন্য যার যার অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে এক খোলা চিঠি দিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা আহমদ শফী। গণমাধ্যমে এই খোলা চিঠি প্রচারিত হয়।

৬ এপ্রিল ২০১৩ সালে তিনি ঢাকামুখী লংমার্চের ঘোষণা দেয় এবং ঢাকায় স্মরণকালের বৃহত্তম জনসমাবেশ ঘটান। সমাবেশ শেষে ঐতিহাসিক ১৩ দফা দাবি পেশ করেন। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ৫ মে ঢাকা অবরোধের ঘোষণা দেন।

তাঁর আন্দোলন শুরু হয়েছিল হাটহাজারীর অজপাড়াগাঁ থেকে। আশ্চর্য, শতবর্ষী এই বৃদ্ধের মৃদুকণ্ঠ বাতাসে ভেসে ভেসে পৌঁছে যায় কোটি মুসলমানের হৃদয় বাতায়নে। তাঁর খোলা চিঠির প্রতিটি শব্দ প্রত্যেক মুসলমানের মনে বারুদের মতো প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হয়। হৃদয়ে শুরু হয় দহন ও কম্পন। তৈরি হয় দুনিয়া-কাঁপানো এক মহাজাগরণ। ৫ মে ২০১৩-এর এক বেদনাদায়ক বাঁকবদলের পর এই আন্দোলনের ধরন, পদ্ধতি, কৌশল ও কর্মপন্থা বদলে যায়। এরপর আল্লামা আহমদ শফী সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, বৈঠক ও দাবি-দাওয়া উত্থাপনের মাধ্যমে তাঁর সংগঠনকে এগিয়ে নেন। অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের সখ্য তৈরি হয়। এর পথ ধরে তিনি শত বছরের অবহেলিত কওমি মাদরাসাগুলোকে আরো এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান। আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতিতে ১১ এপ্রিল ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স (অ্যারাবিক)-এর সমমান ঘোষণা করেন।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে বার্ধক্যজনিক কারণে তিনি নিজের কর্মপরিধি সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। এই সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ কারো কারো কর্মকাণ্ডে তাঁর আপন অঙ্গনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়। মৃত্যুর মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে সব প্রশ্নের মীমাংসা করে তিনি তাঁর প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দেহ কবরস্থ হয়েছে, কিন্তু তিনি আছেন, তিনি থাকবেন কোটি মুসলমানের হৃদয়ে।

 

লেখক : ধর্ম বিভাগীয় প্রধান, দৈনিক কালের কণ্ঠ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা