kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সুদ ও একজন শাইলক

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সুদ ও একজন শাইলক

দায়েমি বা সার্বক্ষণিক ফরজ ‘পর্দা’ ও জঘন্যতম হারাম ‘সুদ’। দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিকতা ও যুক্তির চাতুর্যে অনেকেই মহান আল্লাহর এসব বিধানের বিষয়ে উদাসীন!

সুদের কারণে মিথ্যা মোহ, কর্মবিমুখতা, অশান্তি, অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামাজিক ঘৃণা ছড়ায়। এতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায় এবং বিনিয়োগ হ্রাস পায়। মানবরচিত অর্থব্যবস্থায় সুদের জয়গাথা শোনা গেলেও যুগে যুগে এবং দেশে দেশে সুদের সুস্পষ্ট কুফল প্রমাণিত। এমনই বাস্তবতায় শাইলক প্রাসঙ্গিক।

ইহুদি-খ্রিস্টান সামাজিক দ্বন্দ্ব, বিদ্বেষ ও অর্থনৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে  The Merchant of Venice ষোড়শ শতাব্দীর ১৫৯৬ থেকে ১৫৯৯ সালের মধ্যে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার রচিত কমেডি নাটক।

Quality of Mercy এই নাটকের এক বিখ্যাত উক্তি। কাহিনিসূত্রে জানা যায়, ইতালির ভেনিস শহরের নীতিমান ব্যবসায়ী অ্যান্টনিও। আরেক ব্যবসায়ী শাইলক কূটবুদ্ধির ভাণ্ডার, সুদখোর ও নীতিহীন। বিশেষ এক কারণে শাইলকের কাছ থেকে ঋণ নেয় অ্যান্টনিও। কিন্তু শর্ত থাকে, সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে অ্যান্টনিওকে তার শরীরের এক পাউন্ড মাংস কেটে দিতে হবে।

অ্যান্টনিও সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করায় শাইলক তার শরীরের এক পাউন্ড মাংস দাবি করে। আদালতে শাইলক তার দাবিতে অনড়! তখনই ছদ্মবেশী এক তরুণ আইজীবী বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে রক্তপাতহীন এক পাউন্ড মাংস কেটে নিতে শাইলককে আহ্বান করে। রক্তের কথা দলিলে লেখা ছিল না। রক্তপাতহীন মাংস কাটা অসম্ভব। ধূর্ত শাইলক ঝামেলায় পড়ে। বিচারে শাইলক পরাজিত হয় এবং তার অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

বর্তমানে প্রচলিত রীতিতে  cost of fund, cost of management হলো সুদ। হাফেজ ইবনে কাইয়্যিমের ভাষায়, সুদ দুই প্রকার—জলি (প্রকাশ্য) ও খফি (অপ্রকাশ্য)। ইসলামী আদর্শ মতে, সুদ প্রধানত দুই প্রকার—রিবান নাসিয়া বা মেয়াদি সুদ ও রিবাল ফাজল বা মালের সুদ।

আল্লামা হিফজুর রহমান প্রায়োগিক দিক থেকে সুদকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন—মহাজনি সুদ ও বাণিজ্যিক সুদ।

ইসলামী বিশ্বকোষে পাঁচ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘রিবা’ শব্দের ব্যবহার দেখানো হয়েছে—

মেয়াদি ঋণের সুদ, সম্পদ বিনিময়ের সুদ, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কর্মকে সুদ বা রিবা বলা যায়।

উপহারের পেছনে অপেক্ষাকৃত অধিক বা উচ্চতর প্রতিদানের লোভকেও রিবা বলা হয়।

যেকোনো হারাম কাজকে অপারিভাষিক অর্থে রিবা বা বাহুল্য বলা হয়।

অর্থনীতি ও ইসলাম সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছাড়া যদিও রিবা বা সুদকে ভিন্ন মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে সুদ ও রিবা অভিন্ন। মানবতা-নৈতিকতা বিরোধী সুদ বা রিবা লেনদেনের ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ও পেঁচানো ব্যাপার, যার গভীরে অজ্ঞতা, ভ্রান্ত আশা ও লোভ বিদ্যমান।

সুদ বা রিবা ও ব্যবসায়ের মুনাফা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেকে রিবা বা সুদকে আল-কোরআনে ঘোষিত ‘জঘন্যতম হারাম’ হিসেবে মানতে নারাজ। এমনকি তাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জবাব দেওয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। অথচ হালাল জীবিকার সঙ্গে দোয়া-ইবাদত কবুল হওয়া ও পারলৌকিক মুক্তির শর্ত যুক্ত। তাই ঈমান রক্ষা এবং আখিরাতে বাঁচার জন্য সব ধররের সুদ বা রিবা থেকে সব সময় মুসলমানকে বেঁচে থাকতেই হবে। কেননা প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘যে ঋণ কোনো মুনাফা টেনে আনে, তা-ই রিবা।’

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা