kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৬ সফর ১৪৪২

ইমাম গাজালির দৃষ্টিতে মুসলিম নেতৃত্বের শর্ত

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

৮ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ইমাম গাজালির দৃষ্টিতে মুসলিম নেতৃত্বের শর্ত

ইমাম গাজালি একজন রক্ষণশীল, যুক্তিবাদী, খিলাফতপন্থী মুসলিম দার্শনিক ছিলেন। তিনি বাস্তবতামুখী জীবনধারা ও দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থার সমর্থক ছিলেন। ‘মাআরিজুল কুদস’ নামক গ্রন্থে ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, ‘পারস্পরিক সহানুভূতি ও সমাজব্যবস্থা ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। পারস্পরিক সহানুভূতি না থাকলে কোনো মানুষ বাঁচতে পারে না, সমাজব্যবস্থা ও মান-ইজ্জত কিছুই টিকে থাকতে পারে না। সমাজব্যবস্থা ও পারস্পরিক সহানুভূতির জন্য যে বিধি-বিধান ইসলামে রয়েছে, সেটাকে শরিয়ত বলা হয়। তাই শরিয়তের উদ্দেশ্য সহযোগিতামূলক ও সামাজিক।’

ইমাম গাজালি (রহ.) ‘মাকাছিদুল ফালাসিফা’ গ্রন্থে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শ্রেণিবিভাগ বিন্যাস করে  বলেন, মানবজীবনের সহায়ক তিনটি প্রায়োগিক বিজ্ঞানের মধ্যে একটি হলো রাজনীতি। এ তিনটি বিজ্ঞানকে তিনি এভাবে বিন্যাস করেন—রাজনীতি, অর্থনীতি ও নীতিশাস্ত্র।

ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর ‘ইকতিসাদ’ নামক গ্রন্থে বলেন, মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব ইসলামী শরিয়তের আওতাধীন। পাশাপাশি এটি অভিজ্ঞতালব্ধ বুদ্ধিগত ব্যাপার এবং যুক্তি ও অধিবিদ্যাভিত্তিক। তবে এটি চিন্তা-ভাবনার নির্যাস থেকে স্বতন্ত্র। অতএব গ্রিক দর্শনের আদলে মুসলিম নেতৃত্বের স্বরূপ পরীক্ষা করার কোনো অধিকার বা অবকাশ দার্শনিকদের নেই। কেননা মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব যুক্তির চিন্তালব্ধ নয়; বরং নবুয়তের ঐতিহ্য সূত্রে প্রাপ্ত ও ইসলামী শরিয়তের অনুশাসন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

ইমাম গাজালি (রহ.)-এর প্রথম কথা হলো, মুসলিম উম্মাহর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মুসলিম নেতৃত্ব অপরিহার্য। ইমাম বা রাষ্ট্রনায়ক নির্বাচন করা প্রত্যেক মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য। এই নির্বাচনকার্য একটি সম্মিলিত কর্তব্য বা ফরজে কিফায়া। এটি ‘আহলুল হাল্লে ওয়াল-আকদ’ কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে জনসাধারণের বায়আত গ্রহণ করার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

দ্বিতীয়ত, সাহসিকতা ও সামরিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, সেলজুক সুলতানের আনুগত্য ও সামরিক শক্তির সহায়তা এবং খলিফার প্রতি সমর্থন এর জন্য যথেষ্ট। এমনকি কখনো কখনো খলিফার প্রতি তাদের অবাধ্যতা প্রদর্শন বা তাদের অধিকারের সীমা লঙ্ঘন ঘটে থাকলেও খলিফার প্রতি তাদের আনুগত্য অবিচল। কেননা তারা খলিফাকে রক্ষা করা তাদের ধর্মীয় কর্তব্য বলে বিশ্বাস করেন। ইতিপূর্বে খলিফা কখনো এরূপ একটি সহায়ক শক্তি নিজেদের সান্নিধ্যে পাননি।

তৃতীয়ত, প্রশাসনিক দক্ষতার ব্যাপারে তিনি বলেন, খলিফা মুসতাজহির বিচক্ষণতা ও দৃঢ়চিত্ততার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং তাঁর মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের পরামর্শ গ্রহণ করার সদিচ্ছার প্রমাণ দিয়েছেন।

চতুর্থত, আল্লাহভীরুতা বা ধর্মভীরুতা রাষ্ট্রনায়কের জন্য অপরিহার্য।

পঞ্চমত, জ্ঞানসম্পন্ন হওয়ার ব্যাপারে ইমাম গাজালি (রহ.) ‘মুজতাহিদ’ হওয়ার জন্য অতি উচ্চ ধর্মীয় জ্ঞান ও ফিকহবিদ্যার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রনায়কের জন্য ফতোয়া বা ফিকহের সম্মত রায় দেওয়ার যোগ্যতাই যথেষ্ট। তাঁর পক্ষে সব সন্দেহজনক বিষয়ে সর্বাধিক বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ গ্রহণ করা বিধেয়। যাতে তাঁর ধর্মীয় ও ফিকহ সম্পর্কীয় জ্ঞানের পরিসর বর্ধিত হয়।

ষষ্ঠত, ইমাম গাজালি (রহ.) খলিফার পদটিকে মুসলিম সমাজের একমাত্র প্রতীক হিসেবে গণ্য করেন এবং তাকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক সাংবিধানিক মর্যাদা দেন।

সপ্তমত, ‘আত-তিবরুল মাসবুক’ বা নসিহাতুল মুলুক (রাজা-বাদশাদের প্রতি উপদেশ) গ্রন্থে ইমাম গাজালি (রহ.) সুলতান-এর ওপর প্রাচীন ইরানি শাহদের ও বিগত যুগের খলিফাদের সব ক্ষমতা ন্যস্ত করেন এবং সুলতানকে উপদেশ দেন যেন তিনি ওই সব পূর্বসূরির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সমাজে কল্যাণকর ন্যায়নিষ্ঠ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা