kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ লেবানন

মুফতি তাজুল ইসলাম   

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ লেবানন

আরববিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর দেশ লেবানন। লেবাননের আবহাওয়া বেশ মনোরম। সেখানে রয়েছে বেশ কিছু দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থান। ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো প্রতিবছরই পর্যটকদের টানে লেবানন ভ্রমণে। লেবাননের পর্যটন খাতে দেশটির জনশক্তির মোট ৬৫ শতাংশ জড়িয়ে আছে। ভূমধ্যসাগরের পারে হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বমহিমায় অবস্থান করছে পাহাড়ময় লেবানন।

লেবানন ছিল ফিনিশীয়দের আবাসস্থল। তাদের সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করেছে ইংরেজি সাল গণনার আগের দুই হাজার ৫০০ বছর ধরে। এরপর একে একে অনেকেই এসেছে, শাসন করেছে লেবাননকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লেবাননের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফ্রান্সের ওপর। ১৯৪৩ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৪৬ সালে লেবানন থেকে ফ্রান্স সব সেনা সরিয়ে নেয়। সে সময়ই লেবাননে প্রতিষ্ঠিত হয় পুরোপুরি অন্য রকম এক রাজনৈতিক পদ্ধতি—যাকে ‘কনফেসনালিজম’ বলা হয়। ধর্মীয় জনসংখ্যানুপাতে আসন বণ্টনের এমন রীতি লেবানন ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। লেবাননে সুন্নি মুসলমানের অনুপাত ২৮ শতাংশ, শিয়া মুসলমান ২৮ শতাংশ, ম্যারোনেইট খ্রিস্টান ২২ শতাংশ, গ্রিক অর্থোডক্স ৮ শতাংশ, দ্রুজ ৫ শতাংশ ও গ্রিক ক্যাথলিক রয়েছে ৪ শতাংশ। আগে খ্রিস্টানের সংখ্যা মুসলমানের চেয়েও বেশি ছিল। কিন্তু তারা বিভিন্ন দেশে চলে যাওয়ায় তাদের সংখ্যা মুসলমানের চেয়ে কমে গেছে।

আরবদেশ হলেও দেশটিতে রাজতন্ত্র কিংবা পরিবারতন্ত্র নেই। এখানে দেখা যায় ধর্মীয় সংস্কৃতির চমৎকার সমঝোতায় অনুপম চর্চা। এমন উদাহরণ পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। কারণ সরকারের সর্বোচ্চ পদগুলো আনুপাতিক হারে ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতাদের জন্য নির্ধারিত। কেননা লেবানন ধর্ম ও গোষ্ঠীগতভাবে বিভক্ত একটি রাষ্ট্র। এখানে খ্রিস্টান, সুুন্নি ও শিয়া মুসলমানরা একত্রে বাস করে। গোষ্ঠীগুলো লেবাননের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যাপারে চুক্তি করে নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী লেবাননের রাষ্ট্রপতি হবেন একজন ম্যারোনীয় খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী হবেন সুন্নি মুসলমান ও স্পিকার হবেন শিয়া মুসলমান। সংসদের আসনগুলোও অর্ধেক খ্রিস্টান ও অর্ধেক মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত। লেবাননের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল গোষ্ঠী বা গোত্রভিত্তিক। এখানে সব গোষ্ঠী বা দল তাদের কার্যক্রম পরিচালনা ও অধিকার সমানভাবে পেয়ে থাকে। আধুনিক লেবানন হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতি লালন করে আসছে। মূলত ফিনিশীয়দের এ আবাসভূমি কখনো আসিরীয়রা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে আবার কখনো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে পারসিয়ানরা, কখনো গ্রিক, কখনো রোমান, কখনো আরব, কখনো ক্রুসেডার, কখনো ওসমানি খিলাফত আবার কখনো বা তাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে ফ্রান্স। ফলে লেবাননের সংস্কৃতিতে এর কিছু না কিছু প্রভাব রয়েছে। লেবাননে তাদের আসা-যাওয়া, নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি ও আগতদের ধর্মীয় কৃষ্টি—এগুলোর সবই দেশটির উৎসব, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে লেবাননে উৎসব হিসেবে মুসলিম ও খ্রিস্টান উৎসব সমান গুরুত্ব পায়। ছুটির দিনগুলোও নির্ধারিত হয় সেই নিয়মে। বর্তমানে লেবাননে ভূমধ্যসাগরীয় ইউরোপের সংস্কৃতির হাওয়াটা একটু বেশি। আর লেবানন এমন অবস্থানে আছে যে পশ্চিম এশিয়ার জন্য লেবাননকে ইউরোপের প্রবেশদ্বার আর ইউরোপের জন্য একে পশ্চিম এশিয়ার প্রবেশদ্বার বিবেচনা করা হয়। ফলে সংস্কৃতির আসা-যাওয়াটাও সে রকমই।

লেবাননে মোট ১৮টি ধর্মীয় গোষ্ঠী বিদ্যমান। কিন্তু তাদের মধ্যে নজিরবিহীন সমঝোতা বিদ্যমান। দেশে বিদ্যমান ১৮টি দলের মধ্যে সংসদীয় আসন ভাগ করা হয়। দেশের সংসদ চার বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। সংসদ দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন। লেবাননের বৈচারিক ব্যবস্থায় সব ধর্মের লোকজন তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন অনুযায়ী বিয়ে, উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে বিচার পেতে পারে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা