kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৭। ৬ আগস্ট  ২০২০। ১৫ জিলহজ ১৪৪১

এক বকরিতে পরিবারের সবার কোরবানি হবে না

মুফতি মাহমুদ হাসান   

৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গরু, মহিষ ও উটের ক্ষেত্রে একটি প্রাণীতে সর্বাধিক সাতজন কোরবানিতে অংশীদার হতে পারে। চাই একই পরিবারের সদস্য হোক বা একাধিক পরিবারের। আর বকরি, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি প্রাণীতে একজনের বেশি কোরবানি আদায় হবে না। চাই এক পরিবারের সদস্য হোক বা একাধিক পরিবারের। জাবের (রা.) এর বর্ণনা করেন, আমরা (সাহাবিরা) হুদাইবিয়ার বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে কোরবানি করেছি একেকটি উট সাত অংশীদারের পক্ষ থেকে এবং একেকটি গাভিও সাত অংশীদারে। (মুসলিম, হাদিস : ১৩১৮; আবু দাউদ, হাদিস : ২৮০৯; নাসায়ি, হাদিস : ৪৩৯৩)

বর্তমানে মুষ্টিমেয় কিছু ভাই দাবি করেন যে একটি বকরি দ্বারা এক পরিবারের সবার কোরবানি শুদ্ধ হবে। চাই পরিবারের সদস্যসংখ্যা সাত হোক বা আরো বেশি। এটি একটি অযৌক্তিক কথা। কেননা একটি উট বা গাভি দ্বারাও তো সাত সদস্যের বেশি লোকের কোরবানি আদায় হয় না, সেখানে একটি বকরি দ্বারা সাত সদস্যের বেশি লোকের কোরবানি কিভাবে হবে? এই ভাইয়েরা তাঁদের দাবির পক্ষে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করেন। তবে হাদিসগুলো দ্বারা দাবি প্রমাণিত হয় না। নিম্নে সে বিষয়ে আলোচনা করা হলো—

বৈধতার পক্ষে হাদিস ও পর্যালোচনা

এক. হাদিসে এসেছে যে সাহাবিরা একটি বকরি দিয়ে নিজের ও ঘরবাসীর পক্ষ থেকে কোরবানি দিয়ে সবাই মিলে খেতেন। (তিরমিজি, হাদিস : ১৫০৫)

পর্যালোচনা : বিজ্ঞ ইমামরা হাদিসটির কয়েকটি জবাব দিয়েছেন।

ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন, এটি দরিদ্র ব্যক্তির ব্যাপারে, যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, তবু নফল কোরবানি করে এর ঘরবাসী সবাইকে সওয়াব পৌঁছানোর নিয়ত করেছেন এবং সবাইকে নিয়ে গোশত খেয়েছেন। আর এটি স্বতঃসিদ্ধ মাসআলা যে নফল আমল দ্বারা বেশিসংখ্যক মানুষের ইচ্ছা ইসালে সওয়াব করা যায়; কিন্তু ফরজ-ওয়াজিবের ক্ষেত্রে তার অনুমতি নেই। আর এটি ইসলামের প্রথম দিকের ঘটনা, যখন মানুষের দরিদ্রতা বেশি ছিল। (মুয়াত্তা মুহাম্মাদ, পৃষ্ঠা ২১৬)

তাহাবি (রহ.) বলেন, হাদিসটির বর্ণনাভঙ্গি ও অন্য প্রমাণাদির আলোকে প্রতীয়মান হয় যে এটি ইসলামের শুরু যুগের ঘটনা, পরে বিধানটি রহিত হয়ে যায়। (তাহাবি শরিফ ৪/১৭৮)

কাশমিরি (রহ.) বলেন, এখানে পরিবারের সব সদস্যকে গোশত খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অংশীদার করার কথা বলা হয়েছে। সবার ওয়াজিব কোরবানি আদায়ের কথা বলা হয়নি। (আলআরফুশ শাজি ৩/১৬৭)

দুই. হাদিস এসেছে, ‘প্রত্যেক ঘরবাসীর ওপর একটি কোরবানি ও একটি আতিরা রয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২৫)

পর্যালোচনা :

হাদিসটির সূত্রকে ইবনুল কাত্তান, আব্দুল হক ইশবিলি, আল্লামা আইনি (রহ.) প্রমুখ জঈফ বলেছেন। তাই তা অগ্রহণযোগ্য। (আল-বিনায়া ২/১৭)

যদি সূত্র সহিহও মেনে নেওয়া হয়, তবু আগের হাদিসের জবাবগুলোও এখানে প্রযোজ্য। অর্থাৎ হয়তো নফল কোরবানির ইসালে সওয়াব অথবা রহিত। এতে রহিত হওয়ার শক্তিশালী কারণও বিদ্যমান। কেননা হাদিসটিতে কোরবানির সঙ্গে ‘আতিরা’র কথাও আছে, অথচ তা সর্বসম্মতিক্রমে একটি জাহেলি প্রথা। সেটি রহিত করা হয়েছে। বুখারি শরিফে এসেছে, ‘রাসুল (সা.) বলেছেন, ফরা ও আতিরা (প্রথার নামে জন্তু জবাই) বৈধ নয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৪৭৪)

সারাখসি (রহ.) বলেন, হাদিসটিতে ‘ঘরবাসী’ বলতে ঘরের মালিকের কথা বলা হয়েছে। কেননা সাধারণত ঘরের মালিকই ধনী হয়ে থাকে। হাদিসটির মর্ম হলো, প্রত্যেক ঘরের মালিকের ওপর একটি কোরবানি ওয়াজিব। (আলমাবসুত ১২/১২)

তিন. হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি বকরি নিজের ও সব উম্মতের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৮১০)

পর্যালোচনা :

তাহাবি (রহ.) বলেন, অন্য প্রমাণাদির আলোকে প্রতীয়মান হয়, এটি রাসুল (সা.)-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য, অন্যদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। অথবা বিধানটি রহিত। (তাহাবি ৪/১৭৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) নফল কোরবানি করে সব উম্মতকে সওয়াব পৌঁছানোর নিয়ত করেছেন। সবার পক্ষ থেকে ওয়াজিব কোরবানি আদায়ের ঘোষণা দেননি। (বাদায়েউস সানায়ে ৫/৭০)

গাঙ্গুহি (রহ.) বলেন, এই হাদিস অনুসারে এক দেশের সবার ওয়াজিব কোরবানি একটি বকরি দ্বারাই শুদ্ধ হওয়ার কথা এবং রাসুল (সা.)-এর কোরবানির দ্বারা সব সাহাবির কোরবানি আদায় হওয়ার কথা! অথচ এ দুটির কোনোটিই কেউ সঠিক বলবেন না। (আলকাওকাবুদ্দুররি : ২/৩৯৫)। তাই এক বকরিতে পরিবারের সবার কোরবানি হবে না।

[email protected]

মন্তব্য