kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

সিদ্দিক আল মিনশাবি

মিসরের বিখ্যাত কারি

বেলায়েত হুসাইন   

১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মিসরের বিখ্যাত কারি

শায়খ সিদ্দিক আল মিনশাবি মিসরের একজন কোরআন গবেষক ও বিখ্যাত কারি। তাঁর মনকাড়া তিলাওয়াত তাঁকে বিশ্বের অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে অমর করে রেখেছে। কারি সিদ্দিক আল মিনশাবি ১৯১৯ মতান্তরে ১৯২০ সালের ২০ জানুয়ারি মিসরের রাজধানী কায়রোর সাওহাজ জেলার মিনশাহ নামক এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেই তাঁকে ‘মিনশাবি’ বলা হয়। তিনি মাত্র আট বছর বয়সে পবিত্র কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোরআন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। জগদ্বিখ্যাত দুই আলেম শায়খ মুহাম্মদ আবুল আলা ও শায়খ মুহাম্মদ সায়ুদির সরাসরি ছাত্র ছিলেন কারি মিনশাবি।

প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ না করতেই তাঁর সুমধুর তিলাওয়াতের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে জগত্জুড়ে। খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শাসকশ্রেণির সংস্রব এড়িয়ে চলতেন। কারি মিনশাবির তিলাওয়াতের খ্যাতি শুনে মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসের একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাঁকে দিয়ে কোরআন তিলাওয়াতের পরিকল্পনা করেন। আর কারি মিনশাবিকে রাজি করাতে তিনি একজন মন্ত্রীকে পাঠান। মন্ত্রী সিদ্দিক আল মিনশাবিকে প্রলোভন দেখিয়ে বলেন, অনেক বড় সম্মান ও মর্যাদা তাঁকে হাতছানি দিচ্ছে। রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াত তাঁর ভাগ্যের দুয়ার খুলে দিতে পারে। মন্ত্রীর কথা শুনে কারি মিনশাবি রাগতস্বরে জবাব দিলেন, এটা কি খোদ প্রেসিডেন্ট আবদুন নাসেরের সৌভাগ্য নয় যে তিনি কারি সিদ্দিক আল মিনশাবির কণ্ঠে কোরআনের তিলাওয়াত শুনবেন?

সিদ্দিক আল মিনশাবির জীবনের মূল দর্শন ছিল ‘কারিউল কোরআন লা ইউহান’ অর্থাৎ কোরআনের কারি কখনো অবনত হবেন না। মিসরের রাষ্ট্রীয় রেডিও তাঁকে একবার সাক্ষাৎকারের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তিনি তাতে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, ‘আমি রেডিওতে পড়তে চাই না। যশ-খ্যাতির কোনো লোভ আমার নেই। আমি চাই না, শুধু আমার জন্য রেডিও কর্তৃপক্ষ কোনো প্রগ্রামের আয়োজন করুক।’ এ ঘটনার বেশ কিছুদিন পর মিসরের জাতীয় বেতার কারি সিদ্দিক আল মিনশাবির কণ্ঠে ৩০ পারা কোরআন তিলাওয়াত রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত নেয়। বেতার মহাপরিচালক তাঁর কাছে দূত মারফত এসংক্রান্ত একটি অনুরোধপত্র পাঠান। অনুরোধপত্রে তিনি লেখেন, ‘আসন্ন পবিত্র রমজানে ঘরে বসে আপনি যে তিলাওয়াত করবেন, আপনার সম্মতি থাকলে আমরা তা রেকর্ড করতে চাই।’ তিনি সম্মত হলেন। মাসব্যাপী তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড হলো ৩০ পারা পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর তিলাওয়াতের মূল বৈশিষ্ট্য হলো মাখরাজের পূর্ণ অনুসরণ, স্পষ্ট উচ্চারণ ও খোলা আওয়াজ। এসব গুণাবলির কারণেই তিনি সর্বজনপ্রিয় ও বিখ্যাত হন।

কোরআনের বাণী প্রচারের জন্য তিনি ফিলিস্তিন, কুয়েত, লিবিয়া, আলজেরিয়া, ইরাক, সৌদি আরব এবং যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেন। কোরআনের সেবক সিদ্দিক আল মিনশাবিকে সিরিয়া ও ইন্দোনেশিয়া রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মাননা স্মারক প্রদান করে।

১৯৬৬ সালে কোরআনের পাখি আল মিনশাবির কণ্ঠনালিতে ইসোপাজিয়াল ভাইরাস (টিউমার জাতীয় ব্যাধি) ধরা পড়ে। এই পরিস্থিতিতেও তিনি কোরআন তিলাওয়াত ছাড়তে পারেননি। ২০ এপ্রিল ১৯৬৯ এই দুরারোগ্য ব্যাধিতেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। মৃত্যুর পর মিসর তাঁকে প্রথম শ্রেণির জাতীয় পণ্ডিত ও শাস্ত্রকার ঘোষণা করে। 

সূত্র : আলজাজিরা ও উইকিপিডিয়া

মন্তব্য