kalerkantho

মঙ্গলবার  । ২০ শ্রাবণ ১৪২৭। ৪ আগস্ট  ২০২০। ১৩ জিলহজ ১৪৪১

সমাজসংস্কারে মসজিদের ভূমিকা প্রয়োজন

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

১২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সমাজসংস্কারে মসজিদের ভূমিকা প্রয়োজন

মুসলিম সমাজের জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় অনুশীলন থেকে শুরু করে সামাজিক ঐক্য ও সম্মিলিত কর্মকাণ্ডের অনেকটাই মসজিদের ওপর নির্ভরশীল। মসজিদ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের উৎসভূমি। এটি মুসলমানদের আশ্রয়স্থল। মুসলমানরা দিনে পাঁচবার মসজিদে যায়। সেখানে সালাত আদায় করে। তারা মসজিদে আল্লাহর কাছে দয়া, ক্ষমা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রার্থনা করে। মসজিদ মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাতিঘর, তেমনি ইবাদত-বন্দেগির মিহরাব।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে সমাজ পরিবর্তনে মসজিদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। মসজিদ ছিল একই সঙ্গে দাওয়াতি কাজের প্রাণকেন্দ্র ও রাষ্ট্রীয় ভবন। দাওয়াতি কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালনা করা হতো। বিভিন্ন বিষয়ের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখানেই সম্পাদন করা হতো। বিভিন্ন দেশ ও এলাকা থেকে আগত প্রতিনিধি ও মেহমানদের রাসুল (সা.) মসজিদেই স্বাগত জানাতেন। সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে মসজিদেই তিনি মিলিত হতেন এবং তাদের শিক্ষাদান করতেন।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর ও পহেলা হিজরির ১২ রবিউল আওয়াল শুক্রবার বনু নাজ্জার গোত্রের আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়ি এসে পৌঁছেছেন। সে সময় তিনি বলছিলেন, ইনশাল্লাহ, এটিই হবে আমাদের ঘর। এরপর তিনি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর গৃহে স্থানান্তরিত হন।

 

মসজিদ--নববীর নির্মাণ

এরপর রাসুল (সা.) মসজিদ-ই-নববীর নির্মাণকাজ শুরু করেন। মসজিদ নির্মাণের জন্য সেই জায়গা নির্ধারণ করেন, যেখানে গিয়ে তাঁর উট যাত্রাবিরতি করেছিল। সেই জমির মালিক ছিল দুই এতিম বালক। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে সেই জমিন ক্রয় করে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করেন। তিনি নিজেও মসজিদের জন্য ইট ও পাথর বহন করেছিলেন এবং আবৃত্তি করছিলেন,

‘আল্লাহুম্মা লা আইশা ইল্লা আইশান আখেরাহ,

ফাগফির লিল আনসারে ওয়াল মোহাজিরাহ

হাযাল হামালু লা হামালা খায়বারা,

হাযা আবারুর রাব্বিনা ওয়া আতহারা।’

অর্থাৎ হে আল্লাহ, জীবন তো প্রকৃতপক্ষে আখিরাতের,

আনসার ও মোহাজেরদের তুমি ক্ষমা করো,

এই বোঝা খাইবারের বোঝা নয়,

এই বোঝা প্রতিপালকের এবং পবিত্র বোঝা।

সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশাপাশি উচ্ছ্বাসভরে আবৃত্তি করছিলেন :

‘রাঈনা কাদানা ওয়ান নাবিউ ইয়ামাল,

লাযাকা মিন্নাল আমানু ওয়াল মুদাল্লাল।’

অর্থাৎ যদি আমরা বসে থাকি, আর রাসুল (সা.) কাজ করেন, তাহলে আমরা ভ্রষ্ট কাজ করার জন্য দায়ী হব।

সেই জমিতে পৌত্তলিকদের কয়েকটি কবর ছিল, কিছু অংশ ছিল বিরান উঁচু-নিচু। খেজুর ও অন্য কয়েকটি গাছও ছিল, নবী করিম (সা.) পৌত্তলিকদের কবর খোঁড়েন, উঁচু-নিচু জায়গা সমতল করেন। খেজুর ও অন্য গাছ কেটে কেবলার দিকে লাগিয়ে দেন।

মসজিদের দরজার দুটি বাহু ছিল পাথরের, দেয়ালসমূহ কাঁচা ইট এবং কাদা দিয়ে গাঁথা হয়েছিল। ছাদের ওপর খেজুরশাখা ও পাতা বিছিয়ে দেওয়া হয়। তিনটি দরজা লাগানো হয়। কিবলার সামনের দেয়াল থেকে পেছনের দেয়াল পর্যন্ত এক শ হাত দৈর্ঘ্য ছিল। আর প্রস্থ ছিল এর চেয়ে কম। ভিত্তি ছিল প্রায় তিন হাত গভীর।

রাসুল (সা.) মসজিদের অদূরে কয়েকটি কাঁচা ঘর তৈরি করেন। এসব ঘরের দেয়াল খেজুরপাতা ও তার শাখা দিয়ে তৈরি। এসব ঘর ছিল প্রিয় নবী (সা.)-এর সহধর্মিণীদের বাসগৃহ। এগুলো তৈরি হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর ঘর থেকে এখানে এসে ওঠেন। (বুখারি, পৃষ্ঠা ৭১, ৫৫৫, ৫৬০)

এতই সাদামাদা ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মসজিদ। কিন্তু এই মসজিদই পরে মদিনার সোনালি সমাজ বিনির্মাণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। কেননা আক্ষরিক অর্থেই সে মসজিদ ছিল জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। নির্মিত মসজিদ শুধু নামাজ পড়ার জন্যই ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ‘বিশ্ববিদ্যালয়’। এতে মুসলমানরা ইসলামের যাবতীয় জ্ঞান শিক্ষালাভ করত।

এই মসজিদে গোত্রীয় সংঘাত ও ঘৃণা-বিদ্বেষজর্জরিত বিভিন্ন গোত্রের মানুষ পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দের মধ্যে অবস্থান করত। এই মসজিদ ছিল এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে নবগঠিত রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালিত হতো। এখান থেকে বিভিন্ন অভিযানে লোক প্রেরণ করা হতো। এই মসজিদ ছিল একটি সংসদের মতো। এতে মজলিসে শুরা (পরামর্শ সভা) ও মজলিসে এন্তেজামিয়ার অধিবেশন (কার্যকরী সভা) বসত। (আর-রাহিকুল মাখতুম)। ইসলামে মানুষের প্রয়োজন মেটানো ও পারস্পারিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই মসজিদের উদ্যোগে বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহযোগিতা করার কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়, যেমনটা অতীতে ছিল।

মসজিদগুলোতে যত দিন ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ানো হবে না, তত দিন সমাজ থেকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার, পাপাচার ও অনাচার দূর হবে না।

 

মন্তব্য