kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

আয়া সুফিয়ায় শিকল ভেঙে সিজদা

ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক   

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আয়া সুফিয়ায় শিকল ভেঙে সিজদা

মুসলিম বিশ্বকে খেলাফতের মর্যাদা শূন্যকারী আধুনিক তুরস্কের পিতা মোস্তফা কামাল পাশা ১৯২২ সালে তুর্কি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। হয়তো তিনি ‘ইউরোপের রুগ্ণ পুরুষ’ খ্যাতি পাওয়া তুরস্ককে  উন্নতি ও অগ্রগতির দিক থেকে পাশ্চাত্যের সমকক্ষ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তিনি সেই উন্নতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধকরূপে চিহ্নিত করেছিলেন ইসলামকে। উসমানি খেলাফতের সর্বশেষ শায়খুল ইসলামের মাথায় পবিত্র কোরআন ছুড়ে তিনি বলেছিলেন, ‘তুরস্কের উন্নতির পথে এটাই সবচে বড় বাধা!’ মোস্তফা কামাল পাশা জাতীয় জীবন থেকে ইসলামের পরিচয় সূত্রগুলো মুছে ফেলার যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার একটি ছিল ‘আয়া সুফিয়াকে শিকলবন্দি করা’। তবে তিনি আয়া সুফিয়াকে অর্থোডক্স চার্চের হাতে তুলে দেননি; এমনকি মসজিদরূপে ব্যবহারের জন্য নির্মিত মেহরাবটিকেও অক্ষত রেখে শুধু শিকল দিয়ে ঘেরাও করে দিয়েছিলেন।

 

অর্থোডক্স চার্চের প্রসঙ্গ কেন

পঞ্চম খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান জগৎ দুটি বিরাট সাম্রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তাদের ধর্মীয় কেন্দ্রও ছিল বিভক্ত। পূর্ব সাম্রাজ্যের ধর্মনেতাকে বলা হতো পিট্রিক, আর গির্জাকে বলা হতো দ্য হোলি অর্থোডক্স চার্চ। পক্ষান্তরে পশ্চিমা সাম্রাজ্যের প্রধান ধর্মনেতাকে বলা হতো পোপ, আর গির্জাকে বলা হতো রোমান ক্যাথলিক চার্চ। অর্থোডক্স চার্চের কেন্দ্রীয় গির্জা ছিল আয়া সুফিয়া, যা ভ্যাটিকানের চেয়ে প্রাচীন। ৩৬০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম খ্রিস্টান সম্রাট কনস্টান্টিনোপল আয়া সুফিয়া নির্মাণ করেন। ৫৩২ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাস্টিনিয়ান বর্তমান অবকাঠামো তৈরি করেন। ঐতিহাসিক গিবনের অঙ্কিত চিত্রটি হচ্ছে, ‘এই গির্জাকে তারা ঈশ্বরের পবিত্র ঘর বলে বিশ্বাস করত। তাদের কাছে গির্জার সুসংবাদ ছিল যে যখন তুর্কিরা রোমকদের তাড়া করে সেন্ট সুফিয়া গির্জা পর্যন্ত পৌঁছাবে—যেখানে সম্রাট কনস্টান্টাইন কর্তৃক নির্মিত পবিত্র স্তম্ভ রয়েছে, তখন থেকে তাদের বিপর্যয় শুরু হবে। আকাশ থেকে স্বর্গীয় দূত তরবারি হাতে অবতীর্ণ হবেন এবং ওই স্তম্ভের গোড়ায় বসে থাকা জনৈক সাধুর হাতে তা তুলে দেবেন। তুর্কিরা যখন সেন্ট সুফিয়া গির্জার দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেল, তখনো গির্জার ভেতরে আশ্রয়গ্রহণকারী খ্রিস্টানরা আসমানি সাহায্যের আশায় বসে ছিল।’

 

কোরআন-হাদিসে ইস্তাম্বুল শহর

পবিত্র কোরআনের রোম বিজয়ের কথা বলে যে শহর বোঝানো হয়েছে এটিই আয়া সুফিয়ার শহর। হাদিসে শহরটির নাম ‘আল-কুস্তুন্তুনিয়া’। এর অপর নাম ‘মদিনা জানিব মিনহা আল-বাহার ওয়া জানিব মিনহা আল-বার’ অর্থাৎ এমন শহর, যার একদিকে সাগর, অন্যদিকে স্থল। ব্যাখ্যকাররা একমত, এটা তুরস্কের ইস্তাম্বুল। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘অবশ্যই কুস্তুন্তুনিয়া বিজিত হবে; কতই না উত্তম ওই বিজয়ের আমির! আর কতই না উত্তম বাহিনী সেই বাহিনী!’ (মুসনাদে আহমদ)। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ আল-ফাতিহকে বিজয়ের সেই নিয়ামত দিয়েছেন।

 

আয়া সুফিয়া মসজিদ হলো যেভাবে

দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.) জেরুজালেম বিজয়ের সময় পাদ্রিদের অনুরোধ সত্ত্বেও গির্জায় সালাত আদায় করেননি। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, এই অজুহাতে গির্জা মসজিদ বানিয়ে ফেলা হবে। তবে আয়া সুফিয়ার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা জেরুজালেম বিজয় হয়েছিল চুক্তির মাধ্যমে। আর কনস্টান্টিনোপল বিজিত হয়েছিল যুদ্ধের মাধ্যমে। আয়া সুফিয়ার পতন নিশ্চিত হওয়ার পরও সুলতান ফাতিহ নিজে উদ্যোগী হয়ে সন্ধির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সাধুর আসমানি সাহায্যের আশায় তারা অত্যন্ত অপমানজনকভাবে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। সুতরাং গির্জা রক্ষার দায় সুলতানের ওপর ছিল না। তা ছাড়া গির্জা সম্পর্কে খ্রিস্টানদের যে কুসংস্কার ছিল তা চিরতরে বিলুপ্ত করার জন্য হয়তো সুলতান এই পদক্ষেপ অপরিহার্য মনে করেছিলেন।

ইতিহাস সাক্ষী, সুলতান ফাতিহ গির্জায় আশ্রয়গ্রহণকারী একজন মানুষকেও তিনি হত্যা করেননি, সবাইকে নিরাপত্তা দান করেছিলেন।

 

প্রশ্ন উঠতে পারে আরো যেসব ক্ষেত্রে

সমালোচকরা স্পেন বিজেতা খ্রিস্টানদের সব নির্মমতা সম্পর্কে একেবারে নীরব। কর্ডোভা শহরটি খ্রিস্টানরা চুক্তির মাধ্যমে অধিকার করেছিল। চুক্তির একটি বড় শর্ত ছিল, কোনো মসজিদে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা হবে না। অথচ কর্ডোভা গ্র্যান্ড মসজিদের সঙ্গে কী ব্যবহার করা হয়েছে ইতিহাস জানে। শত শত মসজিদ ভেঙে গির্জা নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা ভারতে মালদহ জেলায় প্রাচীন গৌড় রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত মসজিদগুলো নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলেছেন? লোটন মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ বা বারো দুয়ারিকে শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছে কেন? আয়া সুফিয়ায় যখন সালাত আদায়ের প্রসঙ্গ আসে তখন প্রবল আপত্তি আসে এথেন্সের পক্ষ থেকে। অথচ ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা তারা অস্বীকার করতে পারবে না। ঐতিহ্য রক্ষার নাম করে সুলতান মেহমেত মসজিদ, আসলান পাশা মসজিদ, মেহমেত বেই মসজিদ, উসমান শাহ মসজিদ, হামজা বেই মসজিদ, সুলাইমানিয়া মসজিদসহ মুসলিমদের প্রতিটি মসজিদ শিকল পরানো হয়েছে! বিগত অর্ধ শতাব্দীর প্রচেষ্টার পরও একটি মসজিদ নতুন করে প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।

 

আয়া সুফিয়ায় মুসলিম অধিকার

মোস্তফা কামাল পাশা আরবি আজান নিষিদ্ধ করেছিলেন। তুর্কি সংসদে যখন একদিকে আজান নিষিদ্ধের প্রস্তাব পাস করতে থাকেন স্পিকার, আর অন্যদিকে একজন সংসদ সদস্য দাঁড়িয়ে আজান শুরু করেন। বিস্ময়ে স্তব্ধ যখন পার্লামেন্ট কক্ষ, তখনই রাইফেলের শব্দ শোনা গেল। মেঝেতে রক্তাক্ত এক সহকর্মীর লাশ সামনে রেখেও আরেক সংসদ সদস্য আজানের বাকি অংশ সমাপ্ত করেছিলেন। তারপর রাইফেলের আরেকটি শব্দ ভেসে আসে। মসজিদে আজানের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়েছিল। উন্নয়ন নামক ইউরোপীয় প্রতারণার শিকার কামাল পাশার নির্মমতা তুর্কিরা কোনো দিন ভুলবে না। তুর্কিরা প্রতারণার জাল ছিঁড়তে সক্ষম হয়েছে মনে করি। ফলে আয়া সুফিয়ার বর্তমান বাস্তবতা তার শিকল খুলে ফেলা। এখানে আজানের ধ্বনি দিয়ে কাতারবন্দি হয়ে সালাত আদায় তাদের অধিকার।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ

বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা