kalerkantho

রবিবার। ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭। ৯ আগস্ট ২০২০ । ১৮ জিলহজ ১৪৪১

মৌমাছির মধুময় জীবন

মুফতি জাওয়াদ তাহের   

৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন। মানবজাতির প্রয়োজন পূরণের যাবতীয় ব্যবস্থাও করেছেন। মানুষ ছাড়াও পৃথিবীতে বহু সৃষ্ট জীব আছে। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে এগুলো মানবজাতির কল্যাণে নিয়োজিত। মানুষের মতো তাদেরও রয়েছে ভূপৃষ্ঠে অবাধ বিচরণ। তারাও আল্লাহ তাআলার বিশাল সৃষ্ট পরিবারের সদস্য। এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রাণী সম্পর্কে বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল প্রত্যেকটি জীব এবং (বায়ুমণ্ডলে) নিজ ডানার সাহায্যে উড়ন্ত প্রত্যেক পাখি তোমাদের মতোই একেকটি জাতি...।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

এই প্রাণীদের মধ্যে কালো ও সোনালি দাগ কাটা ছোট্ট প্রাণী মৌমাছি। এটি মহান আল্লাহর রহস্যময় সৃষ্টি। ফুলে ফুলে মৌমাছি উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য দেখে বাগানপ্রেমীরা আপ্লুত হয়। আল্লাহর এই ক্ষুদ্র কিট নিয়ে যে ভাববে তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। মহান আল্লাহ মৌমাছির নামে একটি সুরা নাজিল করেছেন। মৌমাছির আরবি নাম ‘নাহল’। কোরআনের ১৬তম সুরা হচ্ছে সুরাতুন নাহল। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আপনার পালনকর্তা মধু মক্ষিকাকে আদেশ দিলেন, পর্বতে, বৃক্ষে এবং উঁচু চালে গৃহ নির্মাণ করো।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৬৮)

মৌমাছির পরিবার

মানুষের মতো মৌমাছির রয়েছে পরিবারব্যবস্থা। একটি মৌচাকে বা পরিবারে তিন শ্রেণির মৌমাছি থাকে। যথা—রানি, পুরুষ ও  শ্রমিক মৌমাছি। রানি মৌমাছি সবচেয়ে বড় প্রকৃতির। একটি চাকে একটিমাত্র রানি মৌমাছি থাকে। এর একমাত্র কাজ ডিম পাড়া। রানি কোন ধরনের ডিম পাড়বে তা তার ইচ্ছাধীন। প্রতিদিন এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ ডিম পাড়ে। জীবনের শেষে তার পাড়া ডিমের সংখ্যা দাঁড়ায় তিন-চার মিলিয়ন। একটি রানি মৌমাছির আয়ুষ্কাল প্রায় দুই থেকে তিন বছর।

রানির সঙ্গে শুধু একটি পুরুষ মৌমাছি মিলিত হতে সক্ষম। তবে মিলিত হওয়ার পর সেই পুরুষ মারা যায়। পুরুষ মৌমাছির আয়ুষ্কাল প্রায় দেড় মাস।

রানি ও পুরুষ বাদে অবশিষ্ট সব সদস্যই শ্রমিক মৌমাছি। এরা নানা দলে ভাগ হয়ে চাকের যাবতীয় কাজ, যেমন—চাক নির্মাণ, ফুলের রস ও পরাগরেণু সংগ্রহ, মধু তৈরি, চাকের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, চাকে বাতাস দেওয়া, চাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ইত্যাদি সম্পন্ন করে। এদের আয়ুষ্কাল প্রায় এক মাস।

যেভাবে মধু আহরণ

মহান আল্লাহ বলেন, ‘এরপর সর্বপ্রকার ফল থেকে ভক্ষণ করো এবং নিজ পালনকর্তার উন্মুক্ত পথে চলমান হও। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৬৯)

প্রথম ধাপে কর্মী মৌমাছি মাঠে গিয়ে ফুলের মধুগ্রন্থি থেকে মধু সংগ্রহ করে। এই সংগৃহীত মধু তারা তাদের দেহের বিশেষ এক থলিতে জমা রাখে। মধু সংগ্রহ শেষে তারা মৌচাকে ফিরে যায়। কর্মী মৌমাছি তাদের সংগৃহীত ফুলের মধু মৌচাকে থাকা মৌমাছির মুখে দিয়ে দেয়। এরপর মৌচাকের এই মৌমাছিগুলো ফুলের রসের সঙ্গে তাদের শরীর থেকে বেশ কয়েক ধরনের এনজাইম (এক ধরনের জৈব-রাসায়নিক অনুঘটক বা উৎসচক পদার্থ) যোগ করে এবং মৌচাকে এই রস জমা করে রাখে। এভাবে বেশ কিছুদিন পর জমা করা এই বিশেষ রস গাঢ় মধুতে রূপান্তরিত হয়।

প্রাণিবিদরা বলেন, এক কেজি মধু সংগ্রহ করতে মৌমাছির চার মিলিয়ন ফুল দরকার হয়। একই পরিমাণ মধু সংগ্রহ করতে মৌমাছির এক লাখ ৮০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। সাত থেকে আট মিনিট সময়ে এরা এক কিলোমিটার উড়তে সক্ষম। একটি মৌমাছি সারা জীবনে অর্ধেক চা চামচের সমপরিমাণ মধু সংগ্রহ করতে পারে। একটি মৌচাকে গড়ে ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মৌমাছি থাকে। মধু সংগ্রহের জন্য একটি মৌমাছি ৫০ থেকে ১০০টি ফুলে বসে। (কানাডিয়ান হানি কাউন্সিল অবলম্বনে)

আর হ্যাঁ, এই বিস্ময়কর পদ্ধতিতে মানুষের কাছে মধু পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছেন মহান আল্লাহ। হে আল্লাহ! আপনার জন্য সব প্রশংসা।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর, ঢাকা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা