kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

রাসুল (সা.)-এর বড় জামাতা

হজরত আবুল আস ইবনে রাবি (রা.)

মাওলানা মুহিউদ্দীন হাতিয়ুভী   

৩ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হজরত আবুল আস ইবনে রাবি (রা.)। রাসুল (সা.)-এর বড় মেয়ে হজরত জয়নব (রা.)-এর জামাতা। আমরা অনেকেই এই মানুষটির সঙ্গে পরিচিত নই। অথচ তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি ও জামাতা।

বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁর নাম বিভিন্নভাবে পাওয়া যায়। যেমন, লাক্বীত, হুশাইম, মিহশাম/মুহাশশিম, ইয়াসির ইত্যাদি। উপনাম আবুল আস। পিতা রাবি ইবনে আব্দুল উজ্জা। মা, হা-লাহ বিনতে খুওয়াইলিদ (হজরত খাদিজা (রা.)-এর বোন)। বংশপরম্পরা। (আল ইসতিআব : ৪/১৭০১, আল ইসাবাহ : ৭/২০৭)

হজরত খাদিজা (রা.) তাঁকে নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করতেন। অন্যদিকে ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত মানুষ। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও অঢেল সম্পদের অধিকারী। রাসুল (সা.) নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে হজরত খাদিজা (রা.)-এর একান্ত অনুরোধেই স্বীয় জ্যেষ্ঠ কন্যা হজরত জয়নব (রা.)-কে তাঁর কাছে বিয়ে দেওয়া হয়।

নবীজি নবুয়তপ্রাপ্তির পর সর্বপ্রথম পরিবার-পরিজনকে ঈমানের দাওয়াত দেন। তাঁর দাওয়াতে হজরত খাদিজা (রা.) ও হজরত জয়নব (রা.)সহ তাঁর সকল কন্যা ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে জামাতা আবুল আস প্রথমে ইসলাম গ্রহণ না করলেও হুদাইবিয়ার সন্ধির পাঁচ মাস পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন।

মক্কা বিজয়ের পূর্বে (ষষ্ঠ হিজরি সনে) ব্যাবসায়িক এক সফরে আবুল আস সিরিয়া যান। সিরিয়া থেকে ফেরার পথে হজরত যায়েদ ইবনে হারিছা (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন ১৭০ জনের একটি সৈন্যদল তাঁদের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁদের সমুদয় সম্পদ জব্দ করে নেয়। তাঁরা মালামাল ফেলে কোনো রকম প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু আবুল আস সঙ্গোপনে হজরত জয়নব (রা.)-এর নিকট গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। হজরত জয়নব (রা.) তাঁকে আশ্রয় দেন।

ফজরের সময় নবীজি (সা.) মসজিদে প্রবেশকালে মহিলাদের এলাকা থেকে হজরত জয়নব (রা.)-এর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। তিনি বলছেন, হে লোকসকল! আমি আবুল আস ইবনে রাবিকে আশ্রয় দিয়েছি। (তাই তোমরা তাঁর ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ কোরো না।) নামাজ শেষে রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামের দিকে ফিরে বসে ইরশাদ করলেন, ‘হে লোকসকল! আমি যে কথাটি শুনেছি, তোমরা কি তা শুনেছ? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, জি হ্যাঁ। ইরশাদ করলেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! তোমরা এ বিষয়টি যখন শুনলে, আমিও তা তখনই শুনলাম। তোমরা জেনে রাখো! মুসলমানদের মধ্যে যে সর্বাপেক্ষা নিম্নমানের সেও যেকোনো ব্যক্তিকে আশ্রয় দিতে পারে।’

রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে কথাগুলো বলার পর স্বীয় কন্যা হজরত জয়নব (রা.)-এর নিকট গিয়ে বললেন, (জয়নব!) তার সমাদর করো, তবে সে যেন তোমার সঙ্গে স্বামীসুলভ আচরণের সুযোগ না পায়। কারণ, এখন তুমি তার জন্য হালাল নও। যেহেতু তুমি মুসলমান আর সে কাফের। এরপর মুসলমানদের যে দলটি বণিকদলের মালসম্পদ জব্দ করে নিয়েছিল, তাদের নিকট গিয়ে বললেন, তোমরা অবশ্যই আবুল আসের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা জানো। বণিকদল থেকে তোমরা যা জব্দ করেছ, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য দান; তোমরাই তার বাস্তব হকদার। তবে সম্ভব হলে সম্পদগুলো আবুল আসকে ফিরিয়ে দাও। তাঁরা নবীজির কথা শোনামাত্রই সমুদয় সম্পদ ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে একেকজন একেকটা জিনিস নিয়ে উপস্থিত হলো। কেউ বালতি, কেউ রশি, কেউ লোটা, মোটকথা যার কাছে যা ছিল সবই ফিরিয়ে দিল।

এরপর আবুল আস তাঁর সমুদয় সম্পদ নিয়ে মক্কায় চলে গেলেন এবং যার যার পাওনা পরিশোধ করে দিলেন। তারপর বললেন, হে কুরাইশ সম্প্র্রদায়! তোমাদের কারো কোনো মাল-সামান কি আমার কাছে রয়ে গেছে? থাকলে বলো। তারা বলল, না। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমরা আপনাকে একজন আমানতদার হিসেবে পেয়েছি।

অতঃপর তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসুল।

আল্লাহর কসম! আমি এ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করিনি শুধু এ কারণে যে, লোকজন বলবে, আমি তোমাদের সম্পদ গ্রাস করার জন্য মুসলমান হয়েছি। এখন আল্লাহ তাআলা যখন তোমাদের সম্পদ তোমাদের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন এবং আমি তা থেকে দায়িত্বমুক্ত হয়ে গেলাম, তখন আমার ইসলাম গ্রহণ করতে কোনো বাধা রইল না। তাই আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। এরপর হজরত আবুল আস (রা.) মদিনায় হিজরত করলেন। (মাজমাউয যাওয়াইদ : হাদিস : ১৫২৩৫, ১৫২৩৬; সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/২১৮-২১৯; সিয়ারু আলামিন নুবালা : ২/১৮, আল-ইসতিআব : ৪/১৭০২, ক্র. ৩০৬১; সিরাতে মুস্তফা : ২/১২৯-১৩০)

মদিনায় আসার পর রাসুল (সা.) তাঁর কাছে জয়নব (রা.)-কে নতুনভাবে নতুন মহর নির্ধারণ করে বিবাহ দিয়েছিলেন। (তিরমিজি : ১/২১৭, আবু দাউদ : ১/৩০৪, আদ্দুররুল মানজুদ : ৪/১১৭)

ইবরাহীম ইবনে মুনজির বলেন, হজরত আবুল আস (রা.) ১২ হিজরি সনের জিলহজ মাসে ইন্তেকাল করেন। (আল-ইসতিআব : ৪/১৭০৪)

 

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া ইসলামিয়া মাইজদী নোয়াখালী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা