kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

বিশ্বের দৃষ্টিনন্দন ১০ মসজিদ

মসজিদুল হারাম, মক্কা, সৌদি আরব   

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



বিশ্বের দৃষ্টিনন্দন ১০ মসজিদ

এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মসজিদ। ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র স্থান ‘কাবা’কে ঘিরে সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে এর অবস্থান। ভেতরের ও বাইরের নামাজের স্থান মিলে মসজিদের বর্তমান কাঠামো প্রায়  ৩,৫৬,৮০০ বর্গমিটার (৮৮.২ একর) জায়গার ওপর স্থাপিত। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই মসজিদটিতে সাধারণ প্রায় ৯ লাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে হজের সময় এর পরিমাণ বেড়ে ৪০ লাখেরও বেশিতে পৌঁছায়।

রাসুল (সা.) কর্তৃক মক্কা বিজয়ের পর কাবাকে কেন্দ্র  করেই আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে এই সুবিশাল মসজিদটি। ৬৯২ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে প্রথম বড় আকারের সংস্কার সাধিত হয়। এর পূর্বে মসজিদ ছিল কাবাকে কেন্দ্র করে একটি খোলা স্থান। অষ্টম শতাব্দীর শেষ নাগাদ মসজিদের পুরনো কাঠের স্তম্ভগুলোর বদলে মার্বেলের স্তম্ভ স্থাপন করা হয় এবং নামাজের স্থান বৃদ্ধিসহ মিনার যুক্ত করা হয়।

১৫৭০ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় সেলিম প্রধান স্থপতি মিমার সিনানকে মসজিদ পুনর্নির্মাণের আদেশ দেন। এ সময় সমতল ছাদগুলোর বদলে ক্যালিগ্রাফি সংবলিত গম্বুজ ও নতুন স্তম্ভ স্থাপন করা হয়। এগুলোই বর্তমান মসজিদের সবচেয়ে পুরনো প্রত্ননিদর্শন।

১৬২১ ও ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দে বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কাবা ও মসজিদ আল হারামের দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সুলতান চতুর্থ মুরাদের শাসনামলে কাবা পুনর্নির্মিত হয় এবং মসজিদ আল হারাম সংস্কার করা হয়। তখন তিনটি নতুন মিনার যুক্ত করা হয়। মেঝেতে স্থাপিত হয় মার্বেলের আচ্ছাদন। এরপর প্রায় তিন শ বছর মসজিদের রূপ অপরিবর্তিত থাকে।

সৌদি শাসন শুরু হওয়ার পর ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আবারও বড় ধরনের সংস্কার সাধিত হয়। এ সময় আরো চারটি মিনার যুক্ত করা হয়, ছাদ সংস্কার করা হয় এবং মেঝে পাথর ও মার্বেল দিয়ে আচ্ছাদিত করা হয়। সাফা ও মারওয়াকে এ সময়ই মসজিদের ভবনের আওতাভুক্ত করা হয়।

১৯৮২ থেকে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজের শাসনামলে সৌদি শাসক কর্তৃক দ্বিতীয়বার সংস্কারকাজ চালানো হয়। এ সময় নামাজের নতুন স্থান এবং বাইরে নামাজ পড়ার স্থান যুক্ত করা হয়। ১৯৮৮ থেকে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তৃতীয় সৌদি সম্প্রসারণ সম্পন্ন হয়। এ সময় ১৮টি মিনার যুক্ত করা হয়। স্থাপন করা হয় প্রায় ৫০০টি মার্বেল স্তম্ভ। যুক্ত করা হয় তাপ নিয়ন্ত্রিত মেঝে, এয়ার কন্ডিশন, চলন্ত সিঁড়ি ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।

২০০৭ খ্রিস্টাব্দে মসজিদ আল হারামের চতুর্থ সম্প্র্রসারণ কার্য শুরু হয়, যা চলমান ২০২০ খ্রিস্টাব্দে শেষ হওয়ার কথা। তৎকালীন বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ মসজিদের ধারণ ক্ষমতা ২০ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেন। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বাদশাহ মারা যাওয়ার পর তাঁর উত্তরসূরি সালমান বিন আবদুল আজিজ এই সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছেন।

 

মসজিদে নববী, মদিনা, সৌদি আরব

সৌদি আরবের মদিনায় এই মসজিদটি অবস্থিত। এই মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং মহানবী (সা.)। এ জন্য এটিকে মসজিদে নববী হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। গুরুত্বের দিক থেকে মসজিদুল হারামের পরই মসজিদে নববীর স্থান। এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় সুন্দরতম মসজিদ এবং এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ মসজিদও বটে। মসজিদটিতে ছয় লাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে মসজিদটি হজরত মোহাম্মাদ (সা.)- এর রওজাসংলগ্ন হওয়ায় হজের সময় প্রায় ১০ লাখ মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করার রেকর্ড রয়েছে। মসজিদের ১০টি মিনারের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু মিনারটির উচ্চতা ১০৫ মিটার। এই মসজিদের এক অংশেই রয়েছে রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারক। রয়েছে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) ও দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর রওজা মোবারকও।

রাসুল (সা.) নিজে ব্যক্তিগতভাবে মসজিদের নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে যুগে যুগে মুসলিম শাসকরা মসজিদ সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধন করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার পর কয়েক দফা মসজিদটির সংস্কার করা হয়। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ইবনে সৌদ মসজিদের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে নামাজের স্থান বাড়ানোর জন্য স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার আদেশ দেন। এ সময় কৌণিক আর্চযুক্ত কংক্রিটের স্তম্ভ স্থাপন করা হয়।

১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ মসজিদের জন্য ৪০,৪৪০ বর্গমিটার জায়গা যুক্ত করেন। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ফাহাদ বিন আবদুল আজিজের শাসনামলে মসজিদ আরো সম্প্র্রসারিত হয়। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ার পর মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় ১.৭ মিলিয়ন বর্গফুট। মসজিদের বিস্তৃত করিডরজুড়ে অটোমেটিক খোলা ও বন্ধ হয়ে যাওয়া ছাতাসদৃশ স্তম্ভগুলো সমগ্র বিশ্বের আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে আরব উপদ্বীপের মধ্যে এখানেই সর্বপ্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। মসজিদে নববী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান বিধায় হজের সময় আগত হাজিরা হজের আগে বা পরে মদিনায় অবস্থান করেন।

 

সুলতান আহমেদ মসজিদ (নীল মসজিদ), ইস্তাম্বুল, তুরস্ক

উসমানীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মসজিদটির প্রযুক্তিগত সৌন্দর্য সত্যিই দারুণ ও চিত্তাকর্ষক। এটি মুসলমানদের জন্য শুধু একটি মসজিদ নয়; বরং এটি ওই অঞ্চলের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় স্থাপত্য-নিদর্শন। দৃষ্টিনন্দন নীল গম্বুজ ও মসজিদের দেয়ালের নীল রঙের টাইলসের কারণে এটি ‘ব্লু  মস্ক’ বা ‘নীল মসজিদ’ নামে পরিচিত। অবশ্য এর অফিশিয়াল নাম ‘সুলতান আহমেদ মসজিদ’।

উসমানি সুলতান প্রথম আহমেদ ১৬০৯ থেকে ১৬১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক এ মসজিদটির স্থপতি ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত প্রযুক্তি ও স্থাপত্যবিদ সেদেফকার মুহাম্মদ আগা। মসজিদটি তুর্কি স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ। মসজিদটির মূল একটি গম্বুজের পাশাপাশি আটটি মাধ্যমিক গম্বুজ রয়েছে। মূল গম্বুজটির উচ্চতা ৪৩ মিটার। মসজিদের চার কোণে চারটি ও পেছনে আরো দুটিসহ মোট ছয়টি সুউচ্চ মিনার রয়েছে। মিনারগুলো দূর থেকে দেখতে পেনসিলের মতো মনে হয়। মসজিদের মিনার ও গম্বুজগুলো নীল-সাদা সিসার গাঁথুনি দ্বারা আচ্ছাদিত এবং মিনার ও গম্বুজের ওপরের ভাগ সোনার প্রলেপযুক্ত তামায় নকশাকৃত।

মসজিদের ভেতরের দিকের ছাদ এবং দেয়ালজুড়ে ২০ হাজার অত্যন্ত উঁচু মানের নীল রঙের আকর্ষণীয় টাইলস বসানো হয়েছে। গম্বুজের ভেতরের কিছু অংশে নীল রং করা হয়েছে। এ ছাড়া অত্যন্ত নিপুণভাবে ২০০টি স্বচ্ছ কাচ গম্বুজটিতে ছোট খিড়কির মতো করে স্থাপন করা হয়েছে। সেগুলো দিয়ে প্রাকৃতিক আলো ভেতরে ঢুকতে পারে। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ২৪০ ফুট ও প্রস্থ ২১৩ ফুট, প্রধান গম্বুজের উচ্চতা ১৪১ ফুট। মিনারের উচ্চতা ২১০ ফুট। সুবিস্তৃত মসজিদ কমপ্লেক্সে আছে একটি মাদরাসা, একটি পান্থনিবাস এবং প্রতিষ্ঠাতার মাজার।

বসফরাস প্রণালীর স্বচ্ছ পানিতে সূর্যাস্তের মন মাতানো দৃশ্য আর রাতের বেলা মসজিদের মূল গম্বুজ, শাখা ও মাধ্যমিক গম্বুজ এবং মিনারগুলোর ওপর বাতির আলোতে সেখানে অভূতপূর্ব এক দৃশ্যের অবতারণা হয়। চোখ-জুড়ানো স্থাপত্যশৈলী, চমৎকার আবহাওয়া ও মসজিদসংলগ্ন পার্কের সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে নীল মসজিদের আঙিনা সব সময় থাকে মানুষের পদভারে মুখরিত।

শাহ ফয়সাল মসজিদ, ইসলামাবাদ, পাকিস্তান

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের উত্তরে মনোহর মারগালা পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এই নান্দনিক স্থাপনার মসজিদটি। সমসাময়িক ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয় বেদুইন তাঁবুর আকৃতির এ মসজিদটিকে। সাধারণ মসজিদের প্রচলিত যে কাঠামো তার সঙ্গে এ মসজিদের ভেতর-বাইরের অবকাঠামোর তেমন মিল নেই। সে কারণে এ মসজিদকে ইসলামের আধুনিক স্থাপত্যের একক নমুনা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশা ফয়সালের আর্থিক সহায়তায় ১৯৭৬ সালে নির্মাণ শুরু হয় এ মসজিদের। এর নির্মাণ খরচ হয় ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি হিসাবে এক হাজার কোটি টাকার বেশি। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এ মসজিদের নকশা নির্বাচন করা হয়। এর নকশাকার তুরস্কের স্থপতি ভেদাত ডালোকে। গম্বুজবিহীন এ মসজিদের রয়েছে আটটি ঢালু ছাদ। মসজিদের দেয়াল থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত সূর্যের আলো প্রবেশের এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যে, মনে হয় সর্বত্র লাইট লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। মসজিদের চারদিকে বিশাল খোলা চত্বর সবুজ বেষ্টনী দ্বারা চিহ্নিত। ওপর থেকে দেখলে সাজানো ছবির মতো মনে হয় মসজিদটিকে। এর মুসল্লি ধারণক্ষমতা কমপক্ষে ৭৪ হাজার। এর মধ্যে মূল প্রার্থনাকক্ষে একসঙ্গে ১০ হাজার, মসজিদের প্রবেশ পথের বর্ধিত অংশে ২৪ হাজার এবং মসজিদের সামনের শাহানে ৪০ হাজার মুসল্লি সালাত আদায় করতে পারেন। তবে মসজিদের বাইরের খোলা চত্বরসহ পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সে একসঙ্গে আড়াই লাখের ওপর লোক জড়ো হতে পারে। এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় এবং জাতীয় মসজিদ। মুসল্লি ধারণক্ষমতার দিক দিয়ে এটি বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মসজিদ। মসজিদের মিনারগুলো মিসাইল আকৃতির। মসজিদটি পাহাড়ের ঢালু পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় দিন-রাত সব সময় কয়েক মাইল দূর থেকে দেখা যায়।

 

সুলতান ওমর আলী সাইফুদ্দিন মসজিদ, ব্রুনাই

আধুনিক ইসলামিক স্থাপত্যের এক চিত্তাকর্ষক উদাহরণ এই সোনার টুপি পরা মসজিদটি। ব্রুনাইয়ের ২৮তম সুলতানের নামানুসারে মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে। মসজিদে ব্যবহার করা পাথর, কার্পেট প্রভৃতি আনা হয়েছিল ইতালি, চীন, ব্রিটেন ও সৌদি আরব থেকে। এটি শুধু ইবাদতখানাই নয়, একটি দর্শনীয় স্থানও বটে। ব্রুনাই নদীর তীরের কাছে একটি কৃত্রিম হ্রদে মসজিদটির অবস্থান। ব্রুনাইয়ের মানুষের কাছে মসজিদটি ওই দেশের প্রধান ল্যান্ডমার্ক। রাজধানী বন্দরসেরি বেগাওয়ানের এই মসজিদ অনেক দূর থেকে দেখা যায়। ১৯৫৮ সালে মসজিদ-দালানের নির্মাণকাজ শেষ হয়। মসজিদটির নকশা তৈরি করেছিলেন একজন ইতালিয়ান স্থপতি।

মসজিদ-দালানে রয়েছে মর্মর পাথরে তৈরি দৃষ্টিনন্দন কয়েকটি মিনার ও সোনালি গম্বুজ। প্রধান গম্বুজটি খাঁটি সোনায় মোড়া। ইসলামিক স্থাপত্যের গৌরব আর ফুলের সৌরভে একাকার হয়ে এ যেন এক স্বপ্নিল জগৎ। মসজিদের উচ্চতা ৫২ মিটার। এতে রয়েছে একটি কার্যকর আধুনিক এলিভেটর (লিফটবিশেষ), যার মাধ্যমে স্থাপনার শীর্ষে উঠে নগরের বিস্তৃত অবারিত দৃশ্যপট দেখা যায়। মসজিদের অভ্যন্তরভাগ ইবাদতের জন্য। এখানে ব্যবহার করা হয়েছে চমৎকার পচ্চিকারি (মোজাইক) রংমিশ্রিত স্বচ্ছ কাচ, খিলান, আধা খিলান, মর্মরস্তম্ভ প্রভৃতি।

 

ক্রিস্টাল মসজিদ, তেরেনগানু, মালয়েশিয়া

সুন্দর আর স্বচ্ছতা যেকোনো মানুষকেই আকর্ষণ করে। ক্রিস্টাল কাচের চেয়েও স্বচ্ছ কিন্তু কাচ নয়। কাচের চেয়ে ক্রিস্টালের দাম অনেক গুণ বেশি। মূল্যবান সেই ক্রিস্টাল আর সঙ্গে স্বচ্ছ কাচ ও স্টিলের দণ্ড দিয়ে বানানো হয়েছে এই মসজিদটি। স্বচ্ছতার কারণেই মসজিদটির নাম দেওয়া হয়েছে ক্রিস্টাল মসজিদ। মালয়েশিয়ার তেরেনগানু এলাকার ‘পোলা ও ওয়ান ম্যান’ দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছে মুসলিম স্থাপত্যের অপূর্ব এই নিদর্শন।

প্রাকৃতিক শোভা ও মননশীল নির্মাণশৈলীর অভূতপূর্ব সমন্বয়ে তৈরি এই মসজিদটি শুধু মালয়েশিয়া নয়, পুরো বিশ্বের কাছে অতি আশ্চর্য ও মনোমুগ্ধকর একটি স্থাপনা। উদ্বোধনের মাত্র ছয় দিনের মধ্যে সাত লাখ মানুষ পরিদর্শন করে মসজিদটি। সূর্যের আলোয় মসজিদটির এক রূপ আর রাতের আঁধারে আরেক রূপ পর্যটকদের বিমোহিত ও মুগ্ধ করে। মসজিদটির কিছু অংশ সমুদ্রে আর কিছু অংশ স্থলে হওয়ায় আশপাশে এক নৈসর্গিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। এর স্বচ্ছ কাচের দিকে তাকিয়ে দেখা যায় আশপাশের দৃশ্য। রাতে আলোর ঝলকানি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

মসজিদের ভেতরে রয়েছে তারবিহীন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্রডব্যান্ড সংযোগ। ফলে মুহূর্তেই ইমাম সাহেবের ওয়াজ ও খুতবা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বে। মসজিদটি নির্মাণে সমন্বয় করা হয়েছে ইসলামী স্থাপত্য এবং মালয় ও চীনের শিল্প রীতির। এর দরজা ও জানালার কাঠের নকশা যোগ করেছে এক নতুন মাত্রার। ২০০৬ সালে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০০৮ সালে। মসজিদটিতে এক হাজার পাঁচ শ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।

কুল শরিফ মসজিদ, কাজান ক্রেমলিন, রাশিয়া

এই মসজিদটি মূলত ১৬ শতকের শুরুতে নির্মিত হয়েছিল। কুল শরিফ নামে সে সময়ের ধর্মীয় একজন স্কলারের নাম অনুসারে মসজিদের নামকরণ করা হয়। ১৫৫২ সালে কাজানকে রাশিয়ান বাহিনী থেকে রক্ষা করার সময় কুল শরিফ তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে মারা যান। ধারণা করা হয়, সেই সময় নির্মিত মিনারসংবলিত মসজিদটিতে গম্বুজও ছিল। মসজিদের নকশা ছিল ঐতিহ্যবাহী ভলগা বুলগেরিয়ার আদলে। নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল প্রথম রেনেসাঁ যুগের সামগ্রী। রাশিয়া-কাজান যুদ্ধে মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্স ইভান দ্য টেরিবলের হাতে ১৫৫২ সালে মসজিদটি ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে কাজান ক্রেমলিন আবার এটি আধুনিক নকশায় নির্মাণ করে। ২০০৫ সালের ২৪ জুলাই মসজিদটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এখানে একসঙ্গে ছয় হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এখানে মোজাইকের নানা নকশা, অলংকার, ক্যালিগ্রাফিসহ আধুনিক অনেক দৃশ্য চোখে পড়ে। কুল শরিফ মসজিদের আধুনিক নির্মাণে নানাভাবে সহায়তা করেছিল সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। মসজিদের ছয়টি মিনারের প্রতিটির উচ্চতা ৫৫ মিটার। বলা হয়, এই মসজিদেই সবচেয়ে বেশি মিনার আছে। ২০০০ সালে মসজিদটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। দ্বিতল এই মসজিদের দোতলায় জাদুঘর রয়েছে বলে বর্তমানে ‘ইসলামের জাদুঘর’ হিসেবে পরিচিত কুল শরিফ মসজিদ। প্রচুর পর্যটক এবং দর্শনার্থীর নিয়মিত সমাগম হয় এই মসজিদ প্রাঙ্গণে।

 

গ্র্যান্ড মস্ক অব ডিজেনি, মালি

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাটির মসজিদ এটি। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির ডিজেনি শহরে এর অবস্থান। নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য না থাকলেও ১২০০ শতাব্দী থেকে ১৩০০ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এটি নির্মিত হয়েছে বলে অধিকাংশের মত। তবে বর্তমানে যে কাঠামোটি দেখা যায় এটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৯০৭ সালে। আর ইউনেস্কো মসজিদটিসহ এর চারপাশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ১৯৮৮ সালে। যত দূর জানা যায়, সুলতান কুনবরু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর তাঁর প্রাসাদটি ভেঙে সেখানে এই মসজিদটি তৈরি করেন। মসজিদের পূর্বদিকে নিজের বসবাসের জন্য তৈরি করেন অন্য একটি প্রাসাদ। তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকার মসজিদের দুটি টাওয়ার নির্মাণ করেন এবং তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকার মসজিদটির চারপাশের দেয়াল নির্মাণ করেন।

বানি নদীর তীরে অবস্থিত মসজিদটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে রোদে শুকানো মাটি। মসজিদটি ২৪৫ বাই ২৪৫ ফুট আয়তনবিশিষ্ট তিন ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর তৈরি। বর্ষাকালে বানি নদীর পানি থেকে এই প্ল্যাটফর্ম মসজিদটিকে সুরক্ষা করে। মসজিদের দেয়ালগুলো তালগাছের কাঠ, যা স্থানীয়ভাবে ‘টরন’ নামে পরিচিত, সেগুলো দ্বারা নকশা করা। শুধু নকশা নয়, তালগাছের কাঠ মসজিদের দেয়ালে এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, যাতে মাটির দেয়াল সহজে ধসে না যায়। প্রতিবছর স্থানীয় মুসলমানরা মসজিদটির সংস্কারকাজ করেন। ১৯৩০ সালে ফ্রান্সে মসজিদটির একটি রেপ্লিকা তৈরি করা হয়। এটি ইট দিয়ে তৈরি এবং এর রং করা হয় লাল।

 

শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ, আবুধাবি, আরব আমিরাত

এটি বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদসমূহের মধ্যে অন্যতম। মসজিদটি নির্মাণকাল ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল। এটি আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় মসজিদ। মসজিদটি ৩০ একর জমির ওপর নির্মিত। বিভিন্ন সাইজের সাতটি গম্বুজ রয়েছে, যার উচ্চতা ২৭৯ ফুট। রয়েছে ৩৫১ ফুট উচ্চতার চারটি মিনার। মুসল্লি ধারণক্ষমতা ৪১ হাজার। রয়েছে নারী ও পুরুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নামাজের স্থান। তিন হাজারের বেশি শ্রমিক মিলে তৈরি করেছে এই বিখ্যাত মসজিদটি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কার্পেটটি বিছানো রয়েছে এই মসজিদেই। সারা দুনিয়ার সর্ববৃহৎ ঝাড়বাতিটিও ঝুলছে এই মসজিদেই; যা ১০ মিটার চওড়া ও ১০ মিটার উচ্চতাসহ ১২ টন ওজনের। এই মসজিদের উন্মুক্ত দরজা বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের নন্দনীয় আর্কিটেকচার প্রত্যক্ষ করার আমন্ত্রণ জানায়।

 

জেসম আসর হাসানুল বলকী মসজিদ, ব্রুনাই

এই মসজিদের ফ্লোরটি মার্বেল পাথর দিয়ে কারুকাজ করা হয়েছে। এই মসজিদটি সুলতান হাসানুল বলকী মুজাদ্দিন ওয়াদ-দুলাহ এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এর নির্মাণকাজ করা হয় ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত। আধুনিক নানা স্থাপত্যের নিদর্শনযুক্ত এই মসজিদটি সুলতানের সিংহাসনে আরোহণের ২৫তম বর্ষের সমাপনান্তে জনগণের প্রতি প্রীতি উপহার ছিল। এখানে একসঙ্গে চার হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

লেখক : অনুবাদক ও মুহাদ্দিস, [email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা