kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

বিপদে এগিয়ে আসা মুমিনের দায়িত্ব

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

১ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিপদে এগিয়ে আসা মুমিনের দায়িত্ব

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে। আগে করোনা আক্রান্ত রোগীর তথ্য শুধু সংবাদপত্র কিংবা টিভি চ্যানেলেই দেখা যেত। এখন প্রত্যেকের প্রতিবেশী বা আত্মীয় কিংবা কোনো না কোনোভাবে পরিচিতদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ শোনা যাচ্ছে।

করোনাভাইরাস এভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে যেমন আমাদের অসাবধানতা দায়ী, তেমনি আমাদের অমানবিক আচরণও নীরবে এই ভাইরাসকে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের প্রতি অমানবিক ও নির্মম আচরণের কারণেই এখন অনেকেই ভয়ে আক্রান্তের খবর গোপন রাখার চেষ্টা করছেন। ফলে এটি খুব সহজেই আমাদের দেশে মহামারি আকার ধারণ করেছে। অথচ আমরা যদি আক্রান্তদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল হতে পারতাম, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই তাঁদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতাম, তাঁদের সেবা করতাম, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতে পারত।

করোনা আক্রান্ত রোগীরা আমাদেরই আপনজন। নিরাপত্তাজনিত কারণে দূরত্ব বজায় রাখলেও তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিন মুমিনের জন্য ইমারতসদৃশ, যার এক অংশ অন্য অংশকে মজবুত করে। এরপর তিনি (হাতের) আঙুলগুলো (অন্য হাতের) আঙুলে (এ ফাঁকে) ঢোকালেন। (বুখারি, হাদিস : ৬০২৬)

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা রোগী থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কিন্তু তাঁদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকার মানসিকতা যেন তাঁদের একঘরে করে না ফেলে সেদিকেও বিশেষ লক্ষ রাখা প্রয়োজন। নিয়মিত তাঁদের খোঁজখবর নিয়ে, আশ্বাস দিয়ে তাঁদের সহযোগিতা করা যেতে পারে। এতে রোগীর মনোবল বেড়ে যাবে। যা একজন রোগীকে সুস্থ হয়ে উঠতে অনেক বেশি সহযোগিতা করে।

পাশাপাশি তাঁদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। কারণ সাধারণত কারো করোনা শনাক্ত হলে তাঁর ঘর-বাড়ি লকডাউন করে দেওয়া হয়। ফলে তাঁরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বাজার-সদাই করার জন্য বাইরে যেতে পারে না। তখন তাঁদের প্রতিবেশীদের দায়িত্ব হয়ে যায় নিরাপদ দূরত্বে থেকে তাঁদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা। তাঁদের বাজার, ওষুধ ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। কারণ যারা বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ায় মহান আল্লাহ তাদের বেশি পছন্দ করেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর প্রশংসায় বলেছেন, ‘আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকার পরও তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের খাবার খাওয়ায়।’ (সুরা দাহর, আয়াত : ৮)।  রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী, সে-ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।’ (আল মুজামুল আউসাত, হাদিস : ৫৭৮৭)।

তবে অবশ্যই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে আক্রান্ত রোগীদের সহযোগিতা করতে হবে। যেমন, তাদের বাজার কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তাঁদের দরজার সামনে রেখে আসা যেতে পারে। পরবর্তীতে তাঁরা এসে তাঁদের জিনিস নিয়ে যাবেন। এতে রোগীর পরিবারের কাউকে আর বাইরে যেতে হবে না। ফলে সংক্রমণ হওয়ারও সুযোগ ঘটবে না।

কারো অবস্থা গুরুতর হয়ে গেলে তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করাও আমাদের সবার দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের ছয়টি অধিকার...‘যখন যে অসুস্থ হবে তার সেবা করো।’ (মুসলিম, হাদিস : ২১৬২)

আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে দুনিয়ার বিপদসমূহের মধ্যকার কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করবে, এর প্রতিদানে আল্লাহ কেয়ামতের দিনের বিপদসমূহের কোনো বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো গরিব লোকের সঙ্গে (পাওনা আদায়ে) নম্র ব্যবহার করবে, আল্লাহ তার সঙ্গে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানে নম্র ব্যবহার করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষত্রুটি গোপন করে রাখবে আল্লাহও তার দোষত্রুটি দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানে গোপন রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্য করে, আল্লাহও ততক্ষণ তাঁর বান্দার সাহায্য করে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৬)

তবে তার মানে এই নয় যে নিজেকে হুমকির মুখে ফেলে দেবে। বরং এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করে রোগীর সেবা করবে।

করোনা আক্রান্ত হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করলে তাঁদের লাশের সম্মান বজায় রাখতে হবে। তাঁর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। লাশ দাফনে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত ব্যক্তি করোনাভাইরাস ছড়ায় না। কিন্তু সংক্রামক ব্যাধি আইন অনুসারে করোনাভাইরাস রোগীর মৃতদেহ বিশেষ নিয়মে দাফন করতে হয়। যে কেউ দূরত্ব বজায় রেখে জানাজায় বা দাফনে অংশ নিতে পারবেন, কিন্তু দাফনের মূল কাজটুকু সুরক্ষা মেনেই করতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুর্দাকে গোসল দেয় এবং তার ত্রুটি গোপন করে, আল্লাহ সে ব্যক্তির গুনাহ গোপন (মাফ) করে দেন। আর যে ব্যক্তি মুর্দাকে কাফন পরাবে আল্লাহ তাকে (জান্নাতি) ফাইন রেশমের বস্ত্র পরিধান করাবেন।’ (ত্বাবারানী কাবীর, হাদিস : ৮০০৪)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পুণ্যের আশায় কোনো মুসলিম ব্যক্তির জানাজায় অনুগমন করে এবং তার জানাজার সালাত আদায় করে এবং তাকে কবরস্থ করে তার জন্য দুই কিরাত সওয়াব রয়েছে। আর যে ব্যক্তি তার জানাজার সালাত আদায় করে অতঃপর ফিরে যায় কবরস্থ করার পূর্বেই সে ব্যক্তি এক কিরাত সওয়াব নিয়ে ফিরে যায়। (নাসায়ি, হাদিস : ১৯৯৬)

তাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে জাহেলি যুগের বর্বর মানুষের মতো তাদের কবর প্রদানে বাধা না দিয়ে নিরাপদে তার দাফনের ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি তার পরিবারের সঙ্গে কোমল আচরণ করা উচিত।

রাসুল (সা.) মৃত ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন। (বুখারি, হাদিস : ১২৪৪)

এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কখনো মৃত ব্যক্তির সম্মান ও পরকালীন মর্যাদা ঘোষণার মাধ্যমে তার পরিবার-পরিজনকে সান্ত্বনা দিতেন। আবদুল্লাহ বিন সাবিত (রা.)-এর মৃত্যু ঘনিয়ে এলে তাঁর মেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানাল তার বাবা শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর নিয়ত অনুযায়ী তাঁকে শাহাদাতের সওয়াব দিয়ে দিয়েছেন। আচ্ছা! তোমরা শাহাদাত কাকে মনে করো? তারা বলল, আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যুবরণ করাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যুবরণ করা ছাড়াও আরো সাত প্রকারের শাহাদাত আছে, এক. প্লেগ রোগে মৃত ব্যক্তি শহীদ, ২. পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি শহীদ, ৩. পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি শহীদ, ৪. প্রাচীর বা ঘর চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি শহীদ, ৫. অভ্যন্তরীণ বিষফোড়ায় মৃত ব্যক্তি শহীদ, ৬. অগ্নিদাহে মৃত ব্যক্তি শহীদ, ৭. প্রসবকালে মৃত নারী শহীদ।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১৮৪৬)

উল্লেখ্য এখন যেমন করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছে, সে যুগে প্লেগ রোগে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করত। তাই কোনো মুমিন করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর ব্যাপারে কোনো অবান্তর মন্তব্য করা যাবে না। এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করা যাবে না।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহামারি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা