kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

অবিশ্বাসীরা পরকালে যেসব বিষয়ের আকাঙ্ক্ষা করবে

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম   

৩০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অবিশ্বাসীরা পরকালে যেসব বিষয়ের আকাঙ্ক্ষা করবে

মানুষের এ জীবন শেষ নয়, আরেকটি জীবন আছে। তা হলো পারলৌকিক জীবন। সে জীবনে মুমিনরা সুখ-শান্তিতে জান্নাতে বসবাস করবে। আর অবিশ্বাসীরা জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। বিচার দিবসে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার পর তারা কিছু বিষয়ের আকাঙ্ক্ষা করবে। কিন্তু তাদের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। তাদের কাঙ্ক্ষিত কয়েকটি বিষয় হলো—

১. মাটি হয়ে যাওয়া : আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, বিচার দিবসে সমগ্র ভূপৃষ্ঠ এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে। এতে মানব-দানব, গৃহপালিত জন্তু, বন্য জন্তু, পশু-পাখি সবাই একত্র হবে। জীবজন্তুদের মধ্যে কেউ দুনিয়ায় অন্য জীবজন্তুর ওপর জুলুম করলে তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়া হবে। এমনকি কোনো শিংবিশিষ্ট ছাগল কোনো শিংহীন ছাগলকে আঘাত করে থাকলে সেদিন তারও প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এ কাজ শেষ হলে সব জীবজন্তুকে আদেশ করা হবে ‘মাটি হয়ে যাও’। তখন সব জীবজন্তু মাটি  হয়ে যাবে। অবিশ্বাসীরা এই দৃশ্য দেখবে, আর তাদের নিশ্চিত জাহান্নামি হওয়ার বিষয়ও বুঝবে। তখন তারা আকাঙ্ক্ষা করবে, হায়! আমরাও যদি মাটি হয়ে যেতাম, তাহলে আমরা হিসাব-নিকাশ ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পেতাম। (সুরা নাবা, আয়াত : ৪০; তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন)

২. নেক কাজ করা : পার্থিব জগৎ হলো নেক অর্জনের সময়। কিন্তু এ জগতে নেক কাজ না করলে পরকালে কঠিন আজাব ভোগ করতে হবে। অবিশ্বাসীরা বিচার দিবসে যখন বুঝতে পারবে পার্থিব জগতে তার কী করা উচিত ছিল আর সে কী করেছে, তখন নেক করার আকাঙ্ক্ষা করবে। কেননা পরকাল কর্মজগৎ নয় প্রতিদান জগৎ। তারা বললে, ‘হায়! এ জীবনের জন্য যদি কিছু আমি আগে প্রেরণ করতাম।’ (সুরা ফজর, আয়াত : ২৪)

৩. আমলনামা না দেওয়ার : মানুষ পার্থিব জীবনে যত ধরনের কাজ-কর্ম করে সবই লেখা হয়। দুই কাঁধের ফেরেশতাদ্বয় তা লিপিবদ্ধ করেন। বিচার দিবসে ব্যক্তির সামনে তা পেশ করা হবে। মুমিনের আমলনামা দেওয়া হবে ডান হাতে, আর কাফির-মুশরিকের আমলনামা দেওয়া হবে বাঁ হাতে। বাঁ হাতে আমলনামা পেয়ে সে আকাঙ্ক্ষা করে বলবে, ‘হায়! আমার হাতে এই আমলনামা দিয়ে সবার সামনে লাঞ্ছিত ও অপমানিত না করে যে শাস্তি দেওয়ার তা দিয়ে ফেললেই ভালো হতো। (সুরা হাক্কাহ, আয়াত : ২৫)

৪. অসৎ লোকের বন্ধু না হওয়া : পার্থিব জীবনে বন্ধুত্বের গুরুত্ব অত্যধিক। তবে বন্ধু নির্বাচনে মুমিনের দেখা উচিত তার মধ্যে ধার্মিকতা আছে কি না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক মানুষ অভ্যাসগতভাবে বন্ধুর ধর্ম ও চালচলন অবলম্বন করে। তাই কিরূপ ব্যক্তিকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা হচ্ছে, তা আগেই ভেবে নেওয়া উচিত। (সহিহ বুখারি)

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো আমাদের বৈঠকের বন্ধুদের মধ্যে কারা উত্তম? তিনি বলেন, যাকে দেখে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যার কথাবার্তায় তোমার জ্ঞান বাড়ে এবং যার কাজ দেখে পরকালের কথা স্মরণ হয়। (তাফসিরে কুরতুবি)

যে দুই বন্ধু পাপ কাজে সম্মিলিত হয় এবং ইসলামী শরিয়তবিরোধী কাজে পরস্পরকে সাহায্য করে, তাদের সবার বিধান এই যে, বিচার দিবসে তারা এই বন্ধুত্বের কারণে কান্নাকাটি করে বলবে, ‘হায়! আমার দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।’ (সুরা ফোরকান, আয়াত : ২৮)

৫. রাসুল (সা.)-এর পথে চলা : যারা শেষ নবী (সা.)-কে জীবদ্দশায় পেয়ে তাঁর প্রতি ঈমান আনেনি এবং পরবর্তীতে যারা শেষ নবী (সা.)-এর আগমন বার্তা শুনে তাঁর আনীত জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেনি তারা বিচার দিবসে আফসোস করবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর সেদিন জালিম আপন হস্তদ্বয় কর্তন করতে করতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রাসুলের পথ অবলম্বন করতাম। (সুরা ফোরকান, আয়াত : ২৮)

৬. আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য : বিচার দিবসে বিচারের পর কাফির-মুশরিকদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, আর তাদের মুখমণ্ডলকে অগ্নিতে ওলটপালট করা হবে। তারা তখন আফসোস করে বলবে, ‘হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রাসুলের আনুগত্য করতাম!’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৬৬)

৭. পৃথিবীতে ফিরে আসা : পরকালে অবিশ্বাসীদের অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হবে। জাহান্নামের শাস্তি দেখার পর তারা পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে যাওয়া কামনা করবে। কিন্তু তা সম্ভব হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি আপনি দেখেন, যখন তাদের জাহান্নামের ওপর দাঁড় করানো হবে। তারা তখন বলবে, হায়! কতই না ভালো হতো, যদি আমরা ফিরে যেতে পারতাম; তা হলে আমরা স্বীয় পালনকর্তার নিদর্শনগুলোর প্রতি মিথ্যারোপ করতাম না এবং আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম। (সুরা আনআম, আয়াত : ২৭)

৮. শয়তান থেকে দূরে থাকা : মানুষ মূলত শয়তানের প্ররোচনায়ই পথভ্রষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু ইহকালে তা বুঝতে পারে না। পরকালে যখন জাহান্নামের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে এবং শয়তানই তাকে পথভ্রষ্ট করেছে বলে বুঝতে পারবে তখন বলবে শয়তান ও আমার মধ্যে যদি পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব থাকত, কতই না ভালো হতো। সে আমাকে পথভ্রষ্ট করতে পারত না। আল্লাহ বলেন, ‘অবশেষে যখন আমার কাছে আসবে, তখন সে শয়তানকে বলবে, হায়! যদি আমার ও তোমার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব থাকত! কত হীন সঙ্গী সে। (সুরা জুখরুফ, আয়াত : ৩৮)

পরকালে সব পাপীই তাদের পাপের কথা স্বীকার করবে এবং নিশ্চিত শাস্তি দেখে মুক্তির নানা আকাঙ্ক্ষা করতে থাকবে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা ও আফসোস তার কোনো কাজে আসবে না।

 

 লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা