kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

রমজান-পরবর্তী মুমিন জীবন

আতাউর রহমান খসরু   

২৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রমজান-পরবর্তী মুমিন জীবন

রমজান মুমিন জীবনের বীজতলা। রমজানে মুমিন তার মন ও মননে ঈমান ও আমলের, আল্লাহভীতি ও আত্মশুদ্ধির যে বীজ সংগ্রহ করে তাই তাকে ফুল ও ফল হয়ে শোভিত ও সমৃদ্ধ করে সারা বছর। রমজানে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টা ও প্রশিক্ষণ বছরজুড়ে তাকে আল্লাহমুখী করে রাখে।

 

ভয় অনুতাপ জাগিয়ে তোলা

রমজানে মুমিন অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি আমল করে। তবে এ জন্য সে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে না বরং সে রমজানের সময়কে আরো বেশি ফলপ্রসূ করতে না পারায় এবং রমজানের বরকত পুরোপুরি অর্জিত না হওয়ায় অনুতপ্ত হয়। বিশেষত রমজানে গুনাহ মাফ হলো কি না এই ভয় তাকে ভীত করে তোলে। কেননা হাদিসে এসেছে, নবী (সা.) মিম্বরে উঠলেন এবং বলেন—আমিন, আমিন, আমিন। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি মিম্বরে উঠছিলেন এবং বলছিলেন আমিন, আমিন, আমিন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই জিবরাইল আমার কাছে এসেছিল। সে বলল, যে রমজান পেল অথচ তাকে ক্ষমা করা হলো না, সে জাহান্নামে যাবে এবং আল্লাহ তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন—বলুন আমিন। আমি বললাম আমিন। যে তার মা-বাবা উভয়কে পেল অথবা তাঁদের একজনকে পেল অথচ তাঁদের মাধ্যমে সে পুণ্যের অধিকারী হতে পারল না এবং সে মারা গেল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন—বলুন আমিন। আমি বললাম আমিন। যার কাছে আপনার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আপনার প্রতি দরুদ পাঠ করল না এবং মারা গেল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন—বলুন আমিন। আমি বললাম আমিন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ১৮৮)

ভালো কাজ করার পর মুমিন আল্লাহর কাছে যেমন তার প্রতিদান প্রত্যাশা করবে, তেমনি নিজের অক্ষমতা ও অপূর্ণতার জন্য আল্লাহর শাস্তির ভয় করবে। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘মুমিন ভালো কাজ করে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে। আর মুনাফিক পাপ কাজ করে এবং মিথ্যা আশার মধ্যে থাকে।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৫/৪৮০)

 

আল্লাহভীতির জীবনযাপন

দীর্ঘ এক মাস রোজা আদায়ের প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

সুতরাং রমজান-পরবর্তী জীবনে যদি আল্লাহর ভয় অন্তরে রেখে চলা যায়, তবে দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনা সার্থক বলে গণ্য হবে। আর আল্লাহভীতিই মুমিন জীবনে সাফল্যের মাপকাঠি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ প্রশস্ত করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত উৎস থেকে জীবিকা দান করেন।’ (সুরা তালাক, আয়াত : ২-৩)

 

আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা

রমজান হলো মুমিনের জন্য ভালো কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়ার মাস। সে এই মাসে তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং ভালো কাজ করা ও মন্দ কাজ পরিহারের অভ্যাস করবে; অতঃপর বছরের অবশিষ্ট দিনগুলোতে সে অনুযায়ী জীবনযাপন করবে। সুতরাং রমজান মাসে যেসব নেক আমল করা হতো তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। মহানবী (সা.) আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উৎসাহিত করেছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) বলেছেন, তোমরা সাধ্যানুযায়ী (নিয়মিত) আমল করবে। কেননা তোমরা বিরক্ত না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ প্রতিদান দেওয়া বন্ধ করেন না। মহান আল্লাহ ওই আমলকে ভালোবাসেন যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। তিনি (সা.) কোনো আমল করলে তা নিয়মিত করতেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৩৬৮)

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-কে তিনি বলেন, ‘হে আবদুল্লাহ! অমুকের মতো হইয়ো না। সে তাহাজ্জুদ আদায় করত, অতঃপর তা ছেড়ে দিয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৫২)

 

মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়

সমাজের অনেককে দেখা যায় রমজান মাসে মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করে এবং রমজানের পর মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না—এটি নিন্দনীয়। মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা সব সময়ের জন্য আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেসব মানুষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যারা মসজিদে উপস্থিত না হয়ে ঘরে নামাজ আদায় করে। তিনি বলেন, ‘যদি ঘরে নারী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা না থাকত, তবে আমি এশার নামাজে দাঁড়াতাম এবং দুই যুবককে নির্দেশ দিতাম যারা (জামাতে অংশ না নিয়ে) ঘরে আছে তাদের পুড়িয়ে দিতে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৮৭৯৬)

 

পাপ কাজে ফিরে না যাওয়া

পাপ কাজ পরিহার করার পর আবার তাতে লিপ্ত হওয়া আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। আল্লাহ কোরআনের একাধিক স্থানে এই শ্রেণির মানুষের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সেই নারীর মতো হইয়ো না, যে তার সুতা মজবুত করে পাকানোর পর তা খুলে নষ্ট করে দেয়।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯২)

অন্য আয়াতে আল্লাহ এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য লঙ্ঘনপ্রবণ কোরো না এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের করুণা দাও। নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।’ (সুরা আলে-ইমরান, আয়াত : ৮)

 

কোরআন চর্চা অব্যাহত রাখা

রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে পরবর্তী যুগের সব মনীষী রমজান মাসে কোরআন চর্চা বাড়িয়ে দিলেও বছরের কোনো সময় তাঁরা কোরআন চর্চা থেকে একেবারেই বিরত থাকতেন না। ইসলামী আইনজ্ঞরা কোরআন থেকে বিমুখ হওয়াকে হারাম বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে কোরআন পরিত্যাগকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুল বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এই কোরআনকে পরিত্যাজ্য মনে করে।’ (সুরা ফোরকান, আয়াত : ৩০)

 

সুযোগ হলে নফল রোজা রাখা

রমজানের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) শাওয়াল মাসে গুরুত্বের সঙ্গে ছয় রোজা পালন করতেন। একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা শাওয়ালের ছয় রোজার মর্যাদা ও ফজিলত প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পূর্ণ বছরই রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬৪)

এ ছাড়া মহানবী (সা.) আইয়ামে বিজ তথা চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমার বন্ধু (সা.) আমাকে তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতি মাসে তিন দিন করে সওম পালন করা, দুই রাকাত সালাতুদ-দুহা আদায় এবং ঘুমানোর আগে বিতর নামাজ পড়া।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৮১)। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা